মরক্কোর গুহায় মানবজীবাশ্ম 

মরক্কোর গুহায় মানবজীবাশ্ম 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬

মরক্কোর আটলান্টিক উপকূলের একেবারেই সাধারণ একটি গুহা। পর্যটকদের চোখ এড়িয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই গুহাই এখন মানব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়কে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। ক্যাসাব্লাঙ্কার টমাস কোয়ারি–১ অঞ্চলের Grotte à Hominidés গুহা থেকে পাওয়া মানব জীবাশ্মগুলির বয়স প্রায় ৭ লক্ষ ৭৩ হাজার বছর। প্রাপ্ত হাড়গুলি শুধু পুরোনোই নয়, খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলোর গঠন এমন এক মিশ্র ছবি দেখায় যার কিছু বৈশিষ্ট্য খুব আদিম, আবার কিছু আধুনিক মানুষের দিকে ইঙ্গিত করে। গবেষকদের মতে, এই মানুষগুলি এমন এক সময়ে বাস করত, যখন হোমো স্যাপিয়েন্স, নিয়ানডারথাল এবং ডেনিসোভান এই তিন মানবগোষ্ঠীর অভিন্ন পূর্বপুরুষদের পথ আলাদা হতে শুরু করে। অর্থাৎ মানব বিবর্তনের এক সংবেদনশীল ‘শাখাবিভাজন’ মুহূর্তের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে এই জীবাশ্ম। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের নেতৃত্বে এক আন্তর্জাতিক গবেষক দল এই আবিষ্কার করেছেন। সঙ্গে ছিলেন ফ্রান্সের উনিভের্সিতে দ্য মঁপেলিয়ে পল ভালেরি ও মরক্কোর প্রত্নতত্ত্ব সংস্থার বিজ্ঞানীরা। কিন্তু এই সাফল্য কোনও হঠাৎ সৌভাগ্য নয়। এর পিছনে রয়েছে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে খনন, স্তর বিশ্লেষণ ও ভূ-প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা। এই দীর্ঘ সময়ের কাজের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল প্রেক্ষাপট। গুহার স্তরগুলি প্রায় অক্ষত অবস্থায় ছিল। কোনও এলোমেলো নড়চড় নেই, কোনও স্তর হারিয়ে যায়নি। ফলে জীবাশ্মর বয়স নির্ধারণে গবেষকেরা পেয়েছেন বিরল নিশ্চয়তা।

ক্যাসাব্লাঙ্কার উপকূলই একটা প্রাকৃতিক আর্কাইভ। এখানে রয়েছে উঁচু হয়ে ওঠা পুরোনো সমুদ্রতট, বালিয়াড়ি ও গুহা। বারবার সমুদ্রপৃষ্ঠের ওঠানামা, বাতাসের গতি আর বালির দ্রুত জমাট বাঁধা। এই সব মিলেই প্রাচীন স্তরগুলোকে দ্রুত সিল করে দিয়েছে। ফলে ভেতরে চাপা পড়া সবকিছু হাড়, পাথরের হাতিয়ার অক্ষত থেকে গেছে। এই গুহার সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার ছিল পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের উলটপালটের রেকর্ড। পৃথিবীর চৌম্বক মেরু সময়ে সময়ে উল্টে যায়। সেই ঘটনাগুলো বিশ্বব্যাপী এক ধরনের সময়চিহ্ন রেখে যায়। সবচেয়ে সাম্প্রতিক বড় পরিবর্তনটির নাম ‘মাতুয়ামা-ব্রুনহেস রিভার্সাল’। এটি ঘটেছিল প্রায় ৭ লক্ষ ৭৩ হাজার বছর আগে। গবেষকেরা গুহা থেকে নিয়েছেন ১৮০টি চৌম্বক স্তরের নমুনা, এই বয়সের মানবস্থানে যা অত্যন্ত বিরল। এর ফলে শুধু মেরু উল্টোনোর ঘটনা নয়, সেই পরিবর্তনের পুরো পর্যায়টিও ধরা পড়েছে, যা প্রায় ৮ থেকে ১১ হাজার বছর স্থায়ী ছিল। আশ্চর্যের বিষয়, মানব জীবাশ্মগুলো ঠিক এই পরিবর্তনকালীন স্তর থেকেই এসেছে। ফসিলগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রায় সম্পূর্ণ একটি প্রাপ্তবয়স্ক চোয়াল, আরেকটি প্রাপ্তবয়স্ক ও একটি শিশুর চোয়ালের অংশ, কয়েকটি মেরুদণ্ডের হাড় ও আলাদা দাঁত। একটি উরুর হাড়ে মাংসাশী প্রাণীর কামড়ের চিহ্নও মিলেছে। ইঙ্গিত, এই গুহা কখনও শিকারির ডেরাও ছিল।

 

সূত্র : Early hominins from Morocco basal to the Homo sapiens lineage.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight − five =