মানুষ, বিড়াল, এক জিন এক রোগ 

মানুষ, বিড়াল, এক জিন এক রোগ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৬ মার্চ, ২০২৬

মানুষ ও তার পোষ্য বিড়ালের মধ্যে সম্পর্ক বরাবরই মধুর এবং আবেগঘন। এবার চিকিৎসাবিজ্ঞানের হাত ধরেই এই চিরপরিচিত গল্প এক নতুন মাত্রা পেলো। সম্প্রতি ওয়েলকাম স্যাঙ্গার ইনস্টিটিউটের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে মানুষ ও বিড়ালের ক্যান্সারের জিনঘটিত ভিত্তি একই ছকে বাঁধা। এই গবেষণার যা ইঙ্গিত তাতে হয়তো ভবিষ্যতে মানুষ ও তার পোষ্যের একই রোগের সমজাতীয় চিকিৎসা পদ্ধতি আসতে চলেছে।

গবেষকরা পাঁচটি দেশের প্রায় ৫০০টি পোষা বিড়ালের টিউমার বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, মানুষের ক্যানসারের সঙ্গে বিড়ালের ক্যানসারের জিনগত মিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বিশেষ করে স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই মিল আরও স্পষ্ট। বিড়ালের ম্যামারি ক্যানসার ও মানুষের ব্রেস্ট ক্যানসারের মধ্যে একাধিক জিনগত পরিবর্তনের সাদৃশ্য পাওয়া গেছে, যা চিকিৎসা গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

গবেষকদের ধারণা এই জিনগত মিলের মূল কারণ হলো আমাদের দৈনন্দিন সহাবস্থান। বিড়াল ও মানুষ একই পরিবেশে বসবাস করে। ফলে দূষণ, খাদ্যাভ্যাস, বা অন্যান্য পরিবেশগত ঝুঁকির প্রভাব দুই প্রজাতির শরীরেই পড়ে। এই অভিন্ন পরিবেশের কারণে ক্যানসারের ঝুঁকিও অনেক ক্ষেত্রে মিল রয়েছে। অর্থাৎ, বিড়ালের শরীরে যে ক্যানসারের সূত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, তা মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

এছাড়া এই গবেষণায় প্রায় ১,০০০টি ক্যানসার-সম্পর্কিত জিন বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং ১৩ ধরনের ক্যানসারের মধ্যে তুলনা করা হয়েছে। এর মধ্যে FBXW7 এবং PIK3CA নামের দুটি জিন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে। মানুষের মতোই, এই জিনগুলির পরিবর্তন ক্যানসারের বিকাশে বড় ভূমিকা পালন করে এবং চিকিৎসার প্রতিক্রিয়াতেও প্রভাব ফেলে। এমনকি কিছু কেমোথেরাপির ওষুধ এই নির্দিষ্ট জিন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারে। এটি ভবিষ্যতে লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসার পথ দেখাতে পারে।

এই গবেষণা ‘এক ওষুধ’ ধারণাকে আরও জোরদার করেছে। এই ধারণা অনুযায়ী, মানব ও পশু চিকিৎসা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। একটির অগ্রগতি অন্যটির উন্নতিতে সহায়ক। অর্থাৎ, মানুষের জন্য তৈরি ওষুধ বিড়ালের ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে, আবার পশু চিকিৎসার অভিজ্ঞতা মানুষের চিকিৎসায় নতুন দিশা দেখাতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এতদিন বিড়ালের ক্যানসারের জিনগত রহস্য প্রায় অজানাই ছিল। এই গবেষণা সেই অন্ধকারে আলো ফেলেছে। এখন বিজ্ঞানীরা আরও নির্ভুলভাবে ক্যানসারের কারণ, ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে কাজ করতে পারবেন।

এককথায়, আমরা এবং আমাদের পোষ্যরা আজ আর শুধু আবেগের বন্ধনে নয়, জৈবিক বন্ধনেও গভীরভাবে আবদ্ধ হয়ে গেছি। হয়তো খুব শিগগিরই এমন এক ভবিষ্যৎকাল আসবে, যেখানে একই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি একসঙ্গে বাঁচাবে মানুষ ও তার আদরের পোষ্যটিকে।

 

সূত্র: ‘Increased risk of cancer in dogs and humans: a consequence of recent extension of lifespan beyond evolutionarily-determined limitations?’ Aging Cancer.

DOI: 10.1002/aac2.12046

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 5 =