মেলাটোনিন কি শিশুদের জন্য নিরাপদ? 

মেলাটোনিন কি শিশুদের জন্য নিরাপদ? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬

শিশুদের ঘুমের সমস্যায় মেলাটোনিন বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এক জনপ্রিয় সমাধানে পরিণত হয়েছে। প্রাকৃতিক হরমোন হওয়ায় এবং সহজলভ্যতার কারণে বহু অভিভাবক একে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা ও চিকিৎসকদের মতামত ইঙ্গিত দিচ্ছে—শিশুদের ক্ষেত্রে মেলাটোনিন ব্যবহারের ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা এখনো যথেষ্টভাবে মূল্যায়িত হয়নি।

মেলাটোনিন মস্তিষ্কে উৎপন্ন একটি হরমোন, যা শরীরের সার্কেডিয়ান রিদম বা ঘুম–জাগরণ চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। সন্ধ্যায় এর নিঃসরণ বৃদ্ধি পায় এবং সকালের আলোতে তা হ্রাস পায়। তবে ঘুম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মেলাটোনিন শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, বিপাকক্রিয়া এবং হরমোনগত বিকাশেও ভূমিকা রাখে। ফলে বেড়ে ওঠার সময় শিশুদের শরীরে এই হরমোনের বহিরাগত সরবরাহ দীর্ঘমেয়াদে কী প্রভাব ফেলতে পারে—তা নিয়ে চিকিৎসকদের উদ্বেগ বাড়ছে।

গবেষণায় দেখা যায়, অটিজম বা এ ডি এইচ ডি-এর মতো স্নায়বিক বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে মেলাটোনিন স্বল্পমেয়াদে উপকারী হতে পারে। তা দেরিতে ঘুম আসার প্রবণতা কমায়, মোট ঘুমের সময় বাড়ায়, মানসিক চাপও কিছুটা কমায়। তবে সাধারণভাবে সুস্থ শিশুদের জন্য এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উচ্চমানের দীর্ঘমেয়াদি প্রমাণ এখনো অত্যন্ত সীমিত।

ওয়ার্ল্ড জার্নাল অফ পেডিয়াট্রিক্স-এ প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, মেলাটোনিনের ব্যবহার যেভাবে দ্রুত বেড়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গবেষণা এখনো গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব, যেমন- বয়ঃসন্ধি, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, বিপাকক্রিয়া ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ—এসব এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো মেলাটোনিন প্রেসক্রিপশন ছাড়াই সরাসরি ওষুধের দোকান থেকে কেনা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক মেলাটোনিন পণ্যে লেবেলে লেখা মাত্রার সঙ্গে আসল মাত্রার বড় পার্থক্য থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘোষিত ডোজের কয়েক গুণ বেশি মেলাটোনিন বা এমনকি অনাকাঙ্ক্ষিত পদার্থ (যেমন- সেরোটোনিন) পাওয়া গেছে। এছাড়া শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় গামি ফর্মে / জিলেটিন সম্বৃদ্ধ থকথকে লজেন্সের আকারে বিক্রি হওয়ায় ভুলবশত অতিরিক্ত সেবনের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, মেলাটোনিনকে কখনোই শিশুদের ঘুমের সমস্যার সহজ ও নিরাপদ সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁরা পরামর্শ দিয়েছেন, শিশুদের ঘুমের সমস্যায় প্রথমেই আচরণগত সমাধান করতে হবে। যেমন- নির্দিষ্ট ঘুমের রুটিন, স্ক্রিন টাইম (মোবাইল/ টিভি দেখা) কমানো। শিশুদের ক্ষেত্রে এটাই প্রাথমিক চিকিৎসা হওয়া উচিত। মেলাটোনিন প্রয়োজন হলে তা চিকিৎসকের পরামর্শে, সর্বনিম্ন কার্যকর ডোজে এবং স্বল্প সময়ের জন্যই ব্যবহার করা উচিত।

এই গবেষণা শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় যে মেলাটোনিন ব্যবহারে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ, পরিষ্কার লেবেলিং এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা জরুরি, যাতে শিশুদের ঘুমের জন্য নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সমাধান নিশ্চিত করা যায়।

 

সূত্র : “Melatonin use in the pediatric population: an evolving global concern” by Judith Owens, 30th April 2025, World Journal of Pediatrics.

DOI: 10.1007/s12519-025-00896-5

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × four =