কোয়ান্টাম প্রযুক্তির দৌড়ে বিশ্ব এখন এক প্রতিযোগিতার মাঠ। কে আগে এমন একটি কম্পিউটার বানাতে পারবে, যা প্রচলিত সুপার-কম্পিউটারকেও পেছনে ফেলে দেবে, এই প্রশ্নকে ঘিরেই চলছে গবেষণা। সেই দৌড়ে নতুন এক ঘোষণা এল রাশিয়া থেকে। তারা তৈরি করেছে ৭২-কিউবিটের একটি নিউট্রাল অ্যাটম কোয়ান্টাম কম্পিউটার প্রোটোটাইপ। এটি কোয়ান্টাম কম্পিউটিং গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে গণ্য। প্রচলিত কম্পিউটার যেখানে বিট ব্যবহার করে অর্থাৎ ০ বা ১, সেখানে কোয়ান্টাম কম্পিউটার কাজ করে কিউবিট দিয়ে। শুধু তাই নয়, এই কিউবিট একই সঙ্গে ০ এবং ১–এর সুপারপজিশনে থাকতে পারে। ফলে এর হিসাব করার ক্ষমতা বহুগুণে বেড়ে যায়। কিন্তু এই কিউবিটকে স্থিতিশীল রাখা, নিয়ন্ত্রণ করা এবং ত্রুটি কমানো, এটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাশিয়ার নতুন প্রোটোটাইপটি এই সমস্যার এক অভিনব সমাধান দেখাচ্ছে। এখানে কিউবিট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে একেকটি আধানহীন পরমাণু। এগুলোকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম লেজার রশ্মির সাহায্যে একটি অদৃশ্য জালের মতো কাঠামোর মধ্যে আটকে রাখা হয়। এই জালকে বলে অপটিক্যাল ল্যাটিস। এই ল্যাটিসে প্রতিটি পরমাণু যেন একটি ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম প্রসেসর। লেজারের সাহায্যে তাদের অবস্থান, শক্তি এবং পারস্পরিক যোগাযোগ অবিশ্বাস্য নির্ভুলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সূক্ষ্ম নিয়ম মেনে তারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তৈরি করে জটিল কোয়ান্টাম দশা। নিউট্রাল অ্যাটম প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, এর স্কেল বাড়ানোর সম্ভাবনা। অর্থাৎ ভবিষ্যতে এতে আরও বেশি সংখ্যক কিউবিট যুক্ত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে এই পদ্ধতিতে কিউবিটগুলোর কোহেরেন্স অর্থাৎ কোয়ান্টাম দশা স্থায়ী থাকার পর্ব অনেক ক্ষেত্রেই বেশি হতে পারে। এতে ত্রুটির হার কমার সম্ভাবনাও থাকে। এই ৭২-কিউবিট প্রোটোটাইপ দেখিয়ে দিচ্ছে যে বড় মাপের কোয়ান্টাম সিস্টেম তৈরি আজ করা আর কল্পনার বিষয় নয়। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এই কম্পিউটার এমন কিছু সমস্যা সমাধান করতে পারবে যা প্রচলিত কম্পিউটারের জন্য প্রায় অসম্ভব। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক জটিল অপ্টিমাইজেশন সমস্যা, যেখানে হাজার হাজার সম্ভাবনার মধ্যে সবচেয়ে ভালো সমাধানটি খুঁজতে হয়। আবার আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফির অনেক পদ্ধতিও কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সামনে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এমনকি নতুন ওষুধ তৈরি, রাসায়নিক বিক্রিয়ার সিমুলেশন কিংবা মহাবিশ্বের জটিল পদার্থবিদ্যা বোঝার ক্ষেত্রেও কোয়ান্টাম কম্পিউটার বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। রাশিয়ার এই অগ্রগতি আরও একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিচ্ছে, কোয়ান্টাম প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা এখন সত্যিই বৈশ্বিক এক বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন সবাই যে যার নিজেদের পদ্ধতিতে এগোচ্ছে। কেউ সুপারকন্ডাক্টিং কিউবিট নিয়ে কাজ করছে, কেউ ফোটোনিক বা আলোকণা ভিত্তিক কিউবিট নিয়ে। নিউট্রাল অ্যাটম পদ্ধতি সেই প্রতিযোগিতায় নতুন একটি শক্তিশালী পথ খুলে দিচ্ছে। এটি হয়তো ভবিষ্যতে অন্য প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এমন এক কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি করবে, যা সত্যিই ব্যবহারিক এবং বৃহৎ স্কেলের। সব মিলিয়ে এই ৭২-কিউবিট প্রোটোটাইপ শুধু একটি যন্ত্র নয়, এটি কোয়ান্টাম তথ্যবিজ্ঞানের দ্রুত এগিয়ে চলা এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত। ক্ষুদ্র পরমাণুগুলিকে কোয়ান্টাম বিট হিসেবে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা যেন কম্পিউটিংয়ের এক সম্পূর্ণ নতুন ভূগোল আঁকতে শুরু করেছেন। সেই ভূগোলে হয়তো আগামী দিনের প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, এমনকি মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেক অজানা প্রশ্নের উত্তরও লুকিয়ে আছে। কোয়ান্টাম যুগের দরজা তাই একটু একটু করে খুলে যাচ্ছে।
সূত্র: Quantum Cookie
