শনির বলয়-রহস্য

শনির বলয়-রহস্য

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

১৭শ শতকে যখন গ্যালেলিও গ্যালেলাই প্রথম দূরবীনে শনিকে দেখেছিলেন, তিনি ঠিক বুঝতে পারেননি কী দেখছেন। গ্রহের দু’পাশে যেন “কান” ঝুলছে! সেই থেকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শনি আর তার বলয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মুগ্ধ করেছে। তারপর আসে ক্যাসিনি হাইগেন্স প্রকল্প। ১৩ বছরের অভিযানে ক্যাসিনি শনির বলয় নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, বিশেষ করে বলয়ের বয়স সংক্রান্ত। দেখা গেল, বলয়গুলো আশ্চর্যজনকভাবে তরুণ, কয়েকশো মিলিয়ন বছরের বেশি নয়। শনির বলয় এত তরুণ কেন? শনির ২৭৪টি চাঁদের মধ্যে এতগুলোর কক্ষপথ এত বেঁকে-চুরে থাকে কেন? শনির ভর যদি এত কেন্দ্রীভূত হয়, তবে তার অক্ষ দুলছে কেন? ২০২২ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলি-র জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একটি সাহসী প্রস্তাব দিলেন। তাঁদের মতে, এক সময় শনির আরেকটি উপগ্রহ ছিল। সেটি টাইটানের খুব কাছে এসে মাধ্যাকর্ষণের ধাক্কায় কক্ষপথ থেকে ছিটকে যায় বা ভেঙে চুরমার হয়। সেই ধ্বংসাবশেষ থেকেই তৈরি হয় শনির বলয়। শুনতে সিনেমার চিত্রনাট্যের মতো। কিন্তু বিজ্ঞান চায় প্রমাণ। এই তত্ত্ব যাচাই করতে SETI ইন্সটিটিউটের মাতিয়া চুকের নেতৃত্বে গবেষকরা কম্পিউটার সিমুলেশন চালান । তাঁরা দেখার চেষ্টা করেন, কাল্পনিক সেই চাঁদ সত্যিই কি শনির এত কাছে আসতে পারত যে ভেঙে বলয় তৈরি হওয়া সম্ভব? গবেষণাপত্রটি এখনও প্রকাশিত না হলেও – প্রকাশের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে।

সিমুলেশনে একটি অদ্ভুত ব্যাপার ধরা পড়ে। যখনই সেই অতিরিক্ত কাল্পনিক চাঁদ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, তখন শনির আরেক চাঁদ হাইপেরিয়ন গায়েব হয়ে যায়। অথচ বাস্তবে হাইপেরিয়ন তো আজও টিকে আছে। তাহলে হিসেব মিলছে না কেন? চুকের কথায়, “শনির বড় চাঁদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোট হাইপেরিয়নই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিয়েছে।“ হাইপেরিয়ন দেখতে আলুর মতো লম্বাটে, গায়ে অসংখ্য গর্ত । তার কক্ষপথ বিশৃঙ্খল, ঘূর্ণনও অদ্ভুত। কিন্তু সে এক অদ্ভুত মাধ্যাকর্ষণ-নাচে বাঁধা টাইটানের সঙ্গে । এই “টাইটান–হাইপেরিয়ন গ্রন্থি” নাকি তৈরি হয়েছে মাত্র কয়েকশো মিলিয়ন বছর আগে – ঠিক সেই সময়ে যখন কাল্পনিক অতিরিক্ত চাঁদটির অদৃশ্য হওয়ার কথা। তাই হয়তো হাইপেরিয়ন ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে যায়নি বরং সে ধ্বংসযজ্ঞ থেকেই জন্ম নিয়েছে । ধরা যাক, অতিরিক্ত চাঁদটি টাইটানের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হল । সংঘর্ষে তৈরি হল টুকরো টুকরো ধ্বংসাবশেষ। সেই ধ্বংসাবশেষ থেকেই জন্ম নিল হাইপেরিয়ন । এই দৃশ্যপটে “প্রোটো-টাইটান” আর ছোট “প্রোটো-হাইপেরিয়ন” একসঙ্গে মিশে তৈরি করে আজকের টাইটান। আর আশপাশে ছড়িয়ে পড়া টুকরো থেকে গড়ে ওঠে হাইপেরিয়ন । এতে টাইটানের কিছু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যেরও ব্যাখ্যা পাওয়া যায় । তার কক্ষপথ কিছুটা উপবৃত্তাকার। একটি সংঘর্ষের পর এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। আবার তার পৃষ্ঠে প্রত্যাশিত সংখ্যক আঘাত-গহ্বর নেই। এটা সম্ভবত সংঘর্ষ-পরবর্তী পুনর্গঠনের ফল। তাহলে বলয়? যদি টাইটান সত্যিই এমন এক মহাজাগতিক সংঘর্ষের ফসল হয়, তবে তার উপবৃত্তাকার কক্ষপথ শনির ভেতরের ছোট চাঁদগুলোর কক্ষপথে অস্থিরতা আনতে পারে। তারা একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মহাজাগতিক বিধ্বংস শুরু করে। সেই সংঘর্ষের ধ্বংসাবশেষের কিছু অংশ শনির দিকে ছিটকে এসে তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, আর সেখান থেকেই তৈরি হয় উজ্জ্বল বরফ-ধূলির বলয়। অর্থাৎ, শনির বলয় কোনও চিরন্তন অলংকার নয়, এটি এক সংঘর্ষমথিত অতীতের স্মারক। ক্যাসিনির পাঠানো তথ্যের বিশ্লেষণ এখনও চলছে। আর সামনে আসছে নতুন অধ্যায় । ২০২৮ সালে উৎক্ষেপণ হওয়ার কথা ড্রাগনফ্লাই মিশনের । ২০৩৪ সালে এটি টাইটানে পৌঁছে একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত অক্টোকপ্টার নামাবে তার পৃষ্ঠে। যেটা গ্যালেলিও গ্যালেলাই-ও হয়ত কল্পনা করতে পারেননি। শনির বলয় তাই শুধু সৌন্দর্য নয়, এক অসমাপ্ত রহস্যের বৃত্ত। আর বিজ্ঞানীরা সেই বৃত্তের ভেতরেই খুঁজে চলেছেন আমাদের সৌরজগতের বিস্ফোরক শৈশবের গল্প।

 

সূত্র: Nautilus; February, 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen + six =