শৈশবেই কি প্রতারণার হাতেখড়ি?

শৈশবেই কি প্রতারণার হাতেখড়ি?

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৫ মার্চ, ২০২৬

আচ্ছা শিশুরা ঠিক কখন প্রথম প্রতারণা করতে শেখে বা মিথ্যা বলে? এমন প্রশ্নখানা কমবেশি সব অভিভাবকের মনেই উঁকি দেয়। এবার এই চাপা কৌতূহলের অবসান হল সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। দেখা গেছে, একেবারে শৈশবের শুরু থেকেই অর্থাৎ যখন তারা পুরোপুরি কথাও বলতে পারে না, তখন থেকেই তাদের মনে প্রতারণামূলক প্রবৃত্তির সূত্রপাত হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ধাপে ধাপে আরও জটিল হয়ে ওঠে। ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এলেনা হোইকা এবং কানাডার অক্সফোর্ড, শেফিল্ড, ওয়ারউইক এবং ওয়াটারলু সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন।

দেখা গেছে, প্রায় ১০ মাস বয়সেই কিছু শিশু প্রতারণার প্রাথমিক ধারণা রপ্ত করতে শুরু করে। ১৭ মাসে পৌঁছে প্রায় অর্ধেক শিশু কোনো না কোনোভাবে চালাকি করতে শেখে। এমনকি ৮ মাস বয়সেও এর সূক্ষ্ম লক্ষণ দেখা গেছে। আরও বিশেষ বিষয় হলো এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং যারা একবার এই প্রবৃত্তির স্বাদ পায়, তারা অবলীলাক্রমে প্রায় প্রতিদিনই চেষ্টা করে ছোটখাটো কৌশল ব্যবহার করতে।

প্রথম দিকে এই প্রতারণার প্রকৃতি খুবই সরল থাকে। যেমন মা-বাবার ডাক না শোনার ভান করা, কোনো জিনিস লুকিয়ে রাখা, বা নিজের করা কাজ অস্বীকার করা। এসব আচরণে ভাষার দক্ষতা খুব বেশি দরকার হয় না, কিন্তু এতে শিশুর উদ্দেশ্য এবং অন্যের চিন্তা বোঝার ক্ষমতার সূচনা স্পষ্ট হয়।

বছর দুয়েক হলে এই আচরণ আরও সচেতন ও উদ্দেশ্যমূলক হয়ে ওঠে। শিশুরা নিষিদ্ধ কিছু লুকিয়ে দেখতে চেষ্টা করে বা কাজ এড়ানোর জন্য অজুহাত তৈরি করে। কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তনটা ঘটে তিন বছর বয়সে এসে। তখন তারা শুধু মিথ্যা বলেই থামে না; বরং গল্প বানায়, সত্যকে আংশিকভাবে উপস্থাপন করে, এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রাখে। কখনও আবার অন্যের মনোযোগ ঘুরিয়ে নিজের উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টাও করে।

এই গবেষণা আমাদের আগের ধারণাকে একেবারেই বদলে দিয়েছে। আগে মনে করা হতো, প্রতারণা করতে হলে উন্নত চিন্তাশক্তি ও ভাষাগত দক্ষতা প্রয়োজন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এর শিকড় অনেক আগেই গড়ে ওঠে। পশুদের আচরণ বিশ্লেষণ করেও গবেষকরা এই ধারণাকে আরও পোক্ত করেছেন।

অধ্যাপক হোইকার মতে, এই গবেষণাটি পিতামাতা এবং শিক্ষাবিদদের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি সকল সন্তানের পিতামাতাকে আশ্বস্ত করে বলেছেন একটা বাচ্চার বিকাশে প্রতারণা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটা ধাপ। শিশুরা কোনোকিছু তার মা বা বাবার কাছ থেকে লুকোচ্ছে মানেই সেটা খারাপ আচরণ নয়। বরং এটি তাদের বুদ্ধিবিকাশ, সামাজিক বোঝাপড়া এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার অংশ। তাই এই আচরণকে স্বাভাবিক বিকাশের একটি ধাপ হিসেবে দেখা উচিত এবং সে অনুযায়ী শিশুকে বুঝে সঠিকভাবে পথনির্দেশ করা জরুরি।

 

সূত্র: The Early Deception Survey (EDS): Its psychometric properties in children aged 10–47 months By panelElena Hoicka , Eloise Prouten, et.al; published in the journal Cognitive Development, 17th March 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven + 3 =