সংক্রমণ ও স্মৃতিভ্রংশ

সংক্রমণ ও স্মৃতিভ্রংশ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩০ মার্চ, ২০২৬

গুরুতর সংক্রমণ কি ভবিষ্যতে স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে? ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পিরি সিপিলা ও তার সহকর্মীরা দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্যতথ্যভান্ডার বিশ্লেষণ করে ৩ লক্ষ ৭৪ হাজারেরও বেশি মানুষের তথ্য খতিয়ে দেখেন। এই বিশাল ডেটাসেট থেকে তারা এমন ২৯টি রোগ শনাক্ত করেন, যেগুলোর সঙ্গে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি সম্পর্কিত। এর মধ্যে ২৭টি ছিল সংক্রমণবিহীন রোগ। যেমন, পারকিনসন্স রোগ বা অ্যালকোহল-সম্পর্কিত নানা শারীরিক সমস্যা। কিন্তু গবেষণার মূল বিষয় ছিল সংক্রমণ এবং ডিমেনশিয়ার মধ্যে সম্পর্ক। তাতে দেখা যাচ্ছে, যেসব সংক্রমণের জন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়, বিশেষ করে মূত্রনালির সংক্রমণ বা অজানা স্থানের ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ সেগুলোর সঙ্গে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির একটি স্পষ্ট যোগসূত্র রয়েছে। সম্পর্কটি অন্য এরকম ২৭টি রোগের প্রভাব বাদ দিয়েও বজায় থাকে। অর্থাৎ সংক্রমণ নিজেই একটি স্বতন্ত্র ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তবে নিশ্চিতভাবে এখনও বলা যাচ্ছেনা, সংক্রমণ সরাসরি ডিমেনশিয়া সৃষ্টি করে কি না। তাদের ধারণা, গুরুতর সংক্রমণ মস্তিষ্কের ইতিমধ্যেই চলতে থাকা অবক্ষয় বা ক্ষয়প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। অন্যভাবে বললে, যাদের মধ্যে ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়া হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, সংক্রমণ সেই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত এগিয়ে দিতে পারে। গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়ের ব্যবধান। দেখা যাচ্ছে, ডিমেনশিয়া ধরা পড়ার প্রায় ৫ থেকে ৬ বছর আগে এসব গুরুতর সংক্রমণ ঘটে। এই সময়টিকে গবেষকরা একটি “সতর্কতার জানালা’’ হিসেবে দেখছেন। সুতরাং যদি এই সময়ে ঝুঁকির লক্ষণগুলো চিহ্নিত করা যায়, তাহলে হয়তো আগাম প্রতিরোধ বা চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আবার ৬৫ বছর বয়সের আগে যাদের ডিমেনশিয়া ধরা পড়ে, তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের প্রভাব আরও বেশি স্পষ্ট। বিশেষ করে পাঁচ ধরনের সংক্রমণ। যার মধ্যে নিউমোনিয়া ও দাঁতের ক্ষয় (ডেন্টাল ক্যারিজ) উল্লেখযোগ্য। তার মানে তরুণদের ক্ষেত্রে সংক্রমণ মস্তিষ্কের ওপর আরও তীব্র প্রভাব ফেলতে পারে। হাসপাতালে চিকিৎসাপ্রাপ্ত সিস্টাইটিস (মূত্রনালীর এক ধরনের সংক্রমণ) এবং শরীরের অজানা স্থানের ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ- এই দুই ধরনের সংক্রমণ পরবর্তী জীবনে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। সংক্রমণ-সম্পর্কিত ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির এক-সপ্তমাংশেরও কম অংশ অন্যান্য পূর্ব-বিদ্যমান রোগ দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংক্রমণ নিজেই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, অন্য কোনো অসুস্থতার কারণে নয়। সব মিলিয়ে বলা যেতে পারে, গুরুতর সংক্রমণকে শুধু সাময়িক অসুস্থতা হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও কারণ-ফল সম্পর্ক এখনও পুরোপুরি প্রমাণিত নয়, তবুও সংক্রমণ প্রতিরোধ, দ্রুত চিকিৎসা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। ভবিষ্যতে আরও গবেষণার মাধ্যমে এই সম্পর্কের প্রকৃতি পরিষ্কার হলে, হয়তো ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে নতুন কৌশলও তৈরি হবে।

সূত্র: The role of noninfectious comorbidities in the association between severe infections and risk of dementia in Finland: A nationwide registry study by Adriana Michalak, Davide Marzoli, Francesco Pietrogiacomi, Damiana Bergamo, Valentina Elce, Bianca Pedreschi, Giorgia Mosca, Alessandro Navari, Michele Emdin, Emiliano Ricciardi, Giacomo Handjaras, and Giulio Bernardi. PLOS Medicine

DOI:10.1371/journal.pmed.1004688

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 2 =