সাপের উপবাস রহস্য

সাপের উপবাস রহস্য

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

সাপ একবার কোনও ভারী শিকার পেয়ে গেলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, কখনও মাসের পর মাস কোনও খাবার ছাড়াই দিব্যি টিকে থাকে। এতদিন ধারণা ছিল, এই উপবাসে টিকে থাকার রহস্য লুকিয়ে আছে তার বিপাকক্রিয়ার ভিতরে। এবার সেখানে আলো ফেলেছে জিনতত্ত্ব। নতুন এক গবেষণা জানাচ্ছে, সাপরা কার্যত ক্ষুধার ডাকটাকেই জিনোম থেকে মুছে ফেলতে পারে। তাদের শরীরে ‘ঘ্রেলিন’ নামের এক গুরুত্বপূর্ণ হরমোনের জিন হয় অনুপস্থিত, নাহয় বিকল। ঘ্রেলিন-কে বলা হয় ‘ক্ষুধা হরমোন’। খিদে পাওয়া, হজম ও চর্বি সঞ্চয়ের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণে এটির বড় ভূমিকা। শুধু সাপ নয়, গিরগিটি এবং মরুভূমির টোডহেড আগামা নামের টিকটিকি গোষ্ঠীতেও একই জিনগত বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে। প্রাণীগুলোর জীবনযাত্রায় একটি মিল আছে – দুইবার আহারের মাঝে বিশাল ফাঁক। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ঘ্রেলিনকে ছেঁটে দেওয়াই দীর্ঘ উপবাসেও টিকে থাকার এক বিবর্তনী শর্টকাট। টেক্সাস ইউনিভার্সিটি অ্যাট আর্লিংটনের জিনতত্ত্ববিদ টড ক্যাস্টো বলেন, “তথ্য তো আমাদের চোখের সামনেই ছিল, কিন্তু সেটাকে এত গভীরে গিয়ে বোঝার কৃতিত্ব এই গবেষকদেরই প্রাপ্য।“ মাছ থেকে মানুষ প্রায় সব মেরুদণ্ডী প্রাণীতেই এই ঘ্রেলিনের অস্তিত্ব রয়েছে। তাই বারবার, আলাদা আলাদা সরীসৃপ গোষ্ঠীতে এই হরমোনের ‘বর্জন’ ক্যাস্টো-র ভাষায়, “অত্যন্ত বিস্ময়কর।“ ঘ্রেলিন আবিষ্কৃত হয় প্রায় ৩০ বছর আগে। তখন মনে হয়েছিল, এই হরমোনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই মানুষের স্থূলতার বিরুদ্ধে বড় অস্ত্র পাওয়া যাবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বোঝা গেল, ক্ষুধা কোনও একক সুইচে চলে না, এটি হরমোনের এক জটিল নেটওয়ার্ক। ঘ্রেলিন তার একমাত্র চালক নয়, এক অংশমাত্র। তবু প্রশ্ন, যদি এই হরমোন এতটাই মৌলিক, তবে কিছু প্রাণী কীভাবে একে ছাড়াই দিব্যি বেঁচে থাকে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই পর্তুগালের পোর্তো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনবিদ রুই রেজেন্দে পিন্টো ও তাঁর সহকর্মীরা ১১২টি সরীসৃপ প্রজাতির জিনোম স্ক্যান করেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, সাপ, গিরগিটি ও টোডহেড আগামাদের ক্ষেত্রে ঘ্রেলিনের জিন হয় সম্পূর্ণই অনুপস্থিত, নয়তো এতটাই বিকৃত যে আর এই হরমোন তৈরি করা সম্ভব নয়। তবে সব সাপের মধ্যে ছবিটা একরকম নয়। বোয়া ও পাইথনের মতো সাপে আংশিক বিকল জিন দেখা গেলেও ভাইপার, কোবরা ও তাদের আত্মীয়দের ক্ষেত্রে ঘ্রেলিনের প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। এর মানে হতে পারে, সাপদের বিবর্তনে ঘ্রেলিন একাধিকবার, আলাদা আলাদা পথে হারিয়ে গেছে। গল্প এখানেই শেষ নয়। গবেষকরা দেখেছেন, MBOAT4 নামের একটি উৎসেচক, যা ঘ্রেলিনকে কার্যকর করে, সেটিও এই প্রাণীগুলোর মধ্যে অনুপস্থিত। ঘ্রেলিন ও MBOAT4 একসঙ্গে হারানো সম্ভবত সেই ‘বুম-অ্যান্ড-বাস্ট’ খাদ্যাভ্যাসের অভিযোজনে। অর্থাৎ, দীর্ঘ অনাহারের পর হঠাৎ বড় শিকার পাওয়ায়। সাধারণত অনাহারের সময় শরীরকে চর্বি ভেঙে শক্তি জোগাতে সাহায্য করে ঘ্রেলিন। কিন্তু এই হরমোন না থাকলে, সাপরা হয়তো উল্টো কাজটা করতে পারে। তারা চর্বি আঁকড়ে ধরে, শক্তি-সাশ্রয়ী ‘লো- পাওয়ার মোডে’ মাসের পর মাস টিকে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে আরেক সুবিধা। ক্ষুধার তাগিদ না থাকলে নড়াচড়া কম হয়, তাতে শক্তি খরচও কম হয়। স্থির থেকে শিকারের অপেক্ষা করা আর আচমকা ঝাঁপিয়ে -পড়াটা শিকারিদের জন্য এক আদর্শ সমাধান। এর আগেও ২০০৯ সালে ক্যাস্টো ও তাঁর দল সাপ, গিরগিটি ও আগামাদের মাইটোকন্ড্রিয়ায়, শক্তি উৎপাদনের কেন্দ্রে, “পাগলাটে, নজিরবিহীন’’ মিউটেশনের কথা জানিয়েছিলেন। কেন এমন হয়, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে এটা স্পষ্ট, এই পরিব্যক্তি খাবারের শক্তি ব্যবহার করার নিয়ম পাল্টে দেয়। ঘ্রেলিন ছাড়াও শরীর কিভাবে খাদ্য ও চর্বি সামলায়, তা বোঝা গেলে মানুষের ক্ষেত্রেও এই হরমোনটির ভূমিকা নতুন চোখে দেখা যেতে পারে। ক্যাস্টো মনে করিয়ে দেন, একসময় গিলা মনস্টার নামের আরেক সরীসৃপকে নিয়ে মৌলিক গবেষণাই পরে GLP-1 ওষুধের জন্ম দিয়েছিল।

 

সূত্র: Science; January 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven − six =