সুকৌশলে শুক্রাণু প্রত্যাখ্যান 

সুকৌশলে শুক্রাণু প্রত্যাখ্যান 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১০ এপ্রিল, ২০২৬

প্রজননের ক্ষেত্রে নিষেক বলতে আমরা বুঝি – কোটি কোটি শুক্রাণু দ্রুতগতিতে ডিম্বাণুর দিকে ছুটে যায়, আর যে আগে পৌঁছায়, সেই ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে সফল হয়। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মিলনের পরই স্ত্রী বেবুন তাদের যোনিপথের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বদলে নিজেই ঠিক করে দিতে পারে কোন শুক্রাণু টিকে থাকবে, আর কোনটি বাদ পড়বে। এই প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে তীব্র হয় তখনই, যখন পুরুষ ও স্ত্রী বেবুনের জিনগত মিল বেশি থাকে। তার মানে প্রজনন শুধু মিলনের উপর নির্ভর করে না, বরং মিলনের পর নারীদেহের ভেতরের জৈবিক প্রতিক্রিয়ার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতি নিজের মতো করে কাছাকাছি জিনের মিলনকে নিরুৎসাহিত করার এক সূক্ষ্ম কৌশল ব্যবহার করছে।

ফ্রান্সের দক্ষিণে একটি বন্দী বেবুন গোষ্ঠীর উপর গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষকরা লক্ষ্য করেন, মিলনের পর স্ত্রী বেবুনের প্রজনননালীতে প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অম্লতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে, যখন সঙ্গীর সঙ্গে জিনগত মিল বেশি থাকে, তখন এই পরিবর্তনগুলো আরও তীব্র হয়। এই পরিবর্তিত পরিবেশ শুক্রাণুর জন্য প্রতিকূল হয়ে ওঠে, ফলে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়।

মিলনের আগে থেকেই স্ত্রী বেবুনের শরীরে কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। মিলনের পূর্বে প্রতিরোধক জিনের কার্যকলাপ কমে যায়, যাতে শুক্রাণু সহজে টিকে থাকতে পারে। কিন্তু মিলনের প্রায় ৪ ঘণ্টার মধ্যেই এই অবস্থা বদলে যায়। গবেষণায় দেখা যায়, মিলনের পর প্রায় ৯৪১টি জিনের কার্যকলাপে পরিবর্তন আসে, যার অনেকগুলোই প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। একইসঙ্গে যোনির pH কমে যায়, অর্থাৎ পরিবেশ আরও অম্লীয় হয়ে ওঠে, যা শুক্রাণুর জন্য ক্ষতিকর।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো “মেজর হিস্টোকমপ্যাটিবিলিটি কমপ্লেক্স’’ (MHC) নামে পরিচিত কিছু জিন। এই জিনগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। গবেষণায় দেখা যায়, যখন পুরুষ ও স্ত্রী বেবুনের MHC জিন বেশি মিল থাকে, তখন স্ত্রী দেহে শক্তিশালী অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় এবং অম্লতাও বেশি বেড়ে যায়। এতে করে জিনগতভাবে কাছাকাছি সঙ্গীর শুক্রাণু টিকে থাকার সম্ভাবনা কমে যাযদ, যা ইনব্রিডিং /অন্তঃপ্রজনন এড়াতে সহায়ক হতে পারে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে জীববিজ্ঞানে বলা হয় “cryptic female choice” অর্থাৎ মিলনের পর নারীদেহের গোপন বাছাই প্রক্রিয়া। এখানে নারী সরাসরি সঙ্গী বেছে নিচ্ছে না, কিন্তু নিজের শরীরের ভেতরের পরিবেশ পরিবর্তন করে কোন শুক্রাণু সফল হবে তা প্রভাবিত করছে।

যদিও গবেষণাটি তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরে করা হয়েছে (৯টি স্ত্রী ও ৪টি পুরুষ বেবুন), তবুও এর ফলাফল প্রজননবিজ্ঞানে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিয়েছে। মানুষের সঙ্গে বেবুনের শারীরিক মিল থাকায়, এই গবেষণা ভবিষ্যতে মানুষের বন্ধ্যাত্ব, গর্ভধারণ ও প্রজনন প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রেও হয়তো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

সূত্র: Evidence for genetically-based sperm discrimination in the vaginal tract of a primate species by Rachel M. Petersen ,Lee (Emily) M. Nonnamaker,et.al; Published on March 31st , 2026.

https://doi.org/10.1371/journal.pbio.3003699

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 + eleven =