চার হাজার বছর আগে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিয়েছিল এক বিস্ময় – সিন্ধু সভ্যতা। আজকের পাকিস্তান, পশ্চিম ভারত, পূর্ব ইরান ও আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে গড়ে ওঠা এই সভ্যতা শুধু নগর পরিকল্পনা বা বাণিজ্যে নয়, রহস্যময় এক লিখনপদ্ধতির জন্যও ইতিহাসে অনন্য হয়ে আছে। “হরপ্পা লিপি’’র পাঠোদ্ধার আজও হয়নি। শত শত চিহ্নের সমন্বয়ে গড়া এই ভাষা যেন এক প্রাচীন ধাঁধা যার সমাধান খুঁজতে বিজ্ঞানীরা এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। চিহ্নগুলির আকারও অদ্ভুত। কখনও কোণায় ছোট ছোট বর্গসহ হীরকাকৃতি, কখনও তিন আঙুলওয়ালা ‘U’, আবার কখনও ডিম্বাকারের মধ্যে তারকার মতো নকশা। আজ পর্যন্ত সবরকমের নিদর্শন পাওয়া গেলেও এর বেশিরভাগই মাটির ফলক, পাথর বা সিলমোহরে খোদাই করা। কিন্তু প্রতিটি লিপিই খুব ছোট। গড়ে মাত্র পাঁচটি করে চিহ্ন। পাঁচটি অক্ষর দিয়ে কি কোনও ভাষার রহস্য ভেদ করা সম্ভব? আরও বড় সমস্যা হলো, এখানে কোনও দ্বিভাষিক সূত্র নেই। যেমন রোসেটা স্টোন মিশরের হায়ারোগ্লিফ পাঠোদ্ধারে সাহায্য করেছিল। সেরকম কিছুই এই সিন্ধু লিপির ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি। ফলে বিজ্ঞানীরা অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। এই লিপি আদৌ কোনও ভাষা বহন করে, নাকি কেবলই প্রতীক বা চিহ্নের সমষ্টি, তা আজও অজানা। এই প্রশ্ন নিয়েই বিভক্ত গবেষকসমাজ। কেউ মনে করেন এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ভাষা, আবার কেউ বলেন, এটি হয়তো কেবল বাণিজ্যিক চিহ্ন বা পরিচয়ের প্রতীক, যেমন আজকের লোগো বা সাইন। এখানেই প্রবেশ করছে আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিজ্ঞানীরা এখন আশা করছেন, এই শক্তিশালী প্রযুক্তি হয়তো হাজার হাজার বছরের পুরনো এই রহস্য ভেদ করতে পারবে। যুক্তরাজ্যের উলভারহ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাইকেল ফিলিপ ওকস দেখিয়েছেন, “হাজার হাজার নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও লেখাগুলোর দৈর্ঘ্য এত ছোট যে নির্ভুল বিশ্লেষণ করা কঠিন। এ আই এখানে সম্ভাব্য চিহ্নের অর্থ বা প্যাটার্ন খুঁজে বের করতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের বিচারবুদ্ধিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে’’। আরেক গবেষক স্টিভ বন্টা-র দাবি, “এই লিপির কিছু অংশ ইতিমধ্যেই আংশিকভাবে পড়া গেছে। কিছু চিহ্ন সম্ভবত সম্পদ বা ওজনের হিসাব বোঝায়”। কিন্তু তাঁর এই দাবি মূলধারার গবেষকদের মধ্যে এখনও স্বীকৃতি পায়নি। সমস্যাটা কোথায়? মূলত পুনরাবৃত্তি ও সংক্ষিপ্ততা-ই। অধিকাংশ লেখাই ছোট এবং একই ধরনের, ফলে কোনও ব্যাখ্যার নির্ভুলতা প্রমাণ করা কঠিন। একেকজন গবেষক একেকভাবে ব্যাখ্যা দেন, কিন্তু কোনটিই সর্বজনগ্রাহ্য হয় না। অন্যদিকে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালযয়ের অধ্যাপক রাজেশ রাও কিছুটা আশাবাদী হলেও সতর্ক। তাঁর মতে, “পুরো লিপি পড়া হয়তো কঠিন, কিন্তু আংশিকভাবে বোঝা সম্ভব, বিশেষ করে সংখ্যা পদ্ধতিটা’’। কিছু নিদর্শনে দেখা যায় খাড়াখাড়ি দাগ, যা সম্ভবত সংখ্যা নির্দেশ করে। পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য বলছে, সিন্ধু সভ্যতায় ১, ২, ৪, ৮, ১৬, ৩২, ৬৪- এই অনুপাতে একটি মানক ওজন ব্যবস্থা ছিল। এই সূত্র ধরে হয়তো সংখ্যাগুলোর অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব। নেব্রাস্কা-লিঙ্কন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষক পিটার রেভেস আরও আশাবাদী। তাঁর দল উপাত্ত অনুসন্ধান ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ ব্যবহার করে দেখেছেন, কিছু কিছু চিহ্নের অর্থ একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাঁর বিশ্বাস, সঠিক গবেষণা পদ্ধতি ও এ আই-এর সহায়তায় একদিন এই রহস্য ভেদ হবেই। তবে একটি বড় শর্ত রয়ে গেছে, নতুন আবিষ্কার। এখনও সিন্ধু সভ্যতার বহু স্থান খনন করা হয়নি। যদি ভবিষ্যতে দীর্ঘতর লেখা বা কোনও দ্বিভাষিক নিদর্শন পাওয়া যায়, তাহলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। সুতরাং, সিন্ধু লিপি আজও এক অজানা কাহিনী। তার প্রতিটি চিহ্নে লুকিয়ে আছে প্রাচীন মানুষের চিন্তা, বাণিজ্য, সমাজ ও সংস্কৃতির ছাপ। এর রহস্য উদ্ধারের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি প্রয়োজন ধৈর্য, অনুসন্ধান এবং মানব মস্তিষ্কের তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ।
সূত্র: Live Science ; Archaeology; March 2026
