আমরা প্রায় সবাই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যখন হাসা উচিত নয়, অথচ ঠিক তখনই হাসি পেয়ে বসে। ক্লাসরুমে, মিটিংয়ে বা গম্ভীর কোনো পরিবেশে হঠাৎ হাসি চেপে রাখতে গিয়ে বরং তা আরও বেড়ে যায়। আসলে এই সাধারণ অভিজ্ঞতার পেছনে রয়েছে জটিল স্নায়ুবিজ্ঞান ও সামাজিক আচরণের ব্যাখ্যা। বিজ্ঞানীদের মতে, হাসি মূলত দুই ধরনের। একটি স্বতঃস্ফূর্ত বা অনিয়ন্ত্রিত হাসি, আর অন্যটি সামাজিক বা ইচ্ছাকৃত হাসি। স্বতঃস্ফূর্ত হাসি এমন এক প্রতিক্রিয়া, যা আমাদের অজান্তেই ঘটে, যেমন কোনো মজার ঘটনা বা অন্য কারও হাসি দেখে হঠাৎ হেসে ফেলা। অন্যদিকে, সামাজিক হাসি অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি হয়। যেমন বন্ধুর কোনো কম মজার গল্প শুনে তাকে খুশি করার জন্য হাসা। এই দুই ধরনের হাসির অন্তরালে মস্তিষ্কের ভিন্ন অংশ সক্রিয় থাকে। ইচ্ছাকৃত হাসি নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কের সেই অংশে যা আমাদের চলাফেরা ও পেশির নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও যুক্ত। যখন আমরা জোর করে হাসি, তখন এই অংশ সক্রিয় হয়। বিপরীতে, স্বতঃস্ফূর্ত হাসি নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কের আবেগ-সম্পর্কিত অংশ দ্বারা, বিশেষ করে অ্যামিগডালা দ্বারা। এ অংশটি সচেতন নিয়ন্ত্রণের বাইরে কাজ করে, ফলে কখনও কখনও আমরা বুঝে ওঠার আগেই হাসি শুরু হয়ে যায়। তবে এই স্বাভাবিক হাসিকে একটি বিরল স্নায়বিক রোগের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়, যাকে বলা হয় ‘সিউডোবালবার অ্যাফেক্ট’। এই অবস্থায় মানুষ হঠাৎ করে অপ্রাসঙ্গিকভাবে হাসতে বা কাঁদতে শুরু করে, যা তার প্রকৃত অনুভূতির সঙ্গে নাও মিলতে পারে। সাধারণ হাসি কিন্তু সামাজিক ও আবেগগত প্রেক্ষাপটের সঙ্গেই সম্পর্কিত। গবেষণায় দেখা গেছে, হাসি অত্যন্ত সংক্রামক। আমরা একা থাকলে যতটা হাসি, অন্যদের সঙ্গে থাকলে তার ৩০ গুণ বেশি হাসি। কারণ, হাসি একটি সামাজিক সংকেত হিসেবে কাজ করে। কেউ হাসলে তা অন্যদের মস্তিষ্কে “এটা মজার’’এমন একটি বার্তা পাঠায়, ফলে বাকিরাও হাসিতে যোগ দেয়। জার্মানির গটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই বিষয়টি নিয়ে একটি পরীক্ষা চালান। স্বেচ্ছাসেবকদের বিভিন্ন মজার কথা শুনিয়ে তাদের মুখের সূক্ষ্ম পেশি নড়াচড়া পরিমাপ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা হাসি আটকানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করেন। যেমন, মনকে অন্যদিকে সরিয়ে রাখা, মুখ গম্ভীর রাখা বা কৌতুকটিকে কম মজার বলে ভাবা। কিছু ক্ষেত্রে কৌশলগুলো কাজ করলেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, অন্য কারও হাসির শব্দ শোনা মাত্রই নিজের হাসি নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে। হাসি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হল, এটি আমাদের মস্তিষ্কের ‘পুরস্কার ব্যবস্থা’র সঙ্গেও যুক্ত। আমরা যখন হাসি, তখন মস্তিষ্ক থেকে এন্ডোজেনাস ওপিওয়েড নামের কিছু রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যার মধ্যে এন্ডোরফিন অন্যতম। রাসায়নিকগুলি আমাদের ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে, ব্যথা কমায়, মানসিক চাপ কমায় এবং শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। ফলে একবার হাসি শুরু হলে মস্তিষ্ক সেটিকে সহজে থামাতে চায় না। তবে হাসি দমন করার চেষ্টা সবসময় কার্যকর হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এর বিপরীত প্রভাব দেখা যায়, যাকে বলা হয় ‘রিবাউন্ড ইফেক্ট’। অর্থাৎ, যতই আমরা হাসি চেপে রাখতে চাই, পরে তা আরও বেশি করে ফিরে আসে। একই ঘটনা চিন্তা দমন করার ক্ষেত্রেও দেখা যায়। কোনো বিষয় না ভাবার চেষ্টা করলে সেটিই মাথায় ঘোরে বেশি। তাই পরের বার যদি ভুল সময়ে হাসি পেয়ে যায়, সেটিকে পুরোপুরি দোষের চোখে দেখার দরকার নেই। মনে রাখতে হবে, হাসি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আমাদের আবেগ, মস্তিষ্কের স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া, শারীরিক প্রতিক্রিয়া এবং আশপাশের মানুষের প্রভাব। এটি কোনো একক সুইচের মতো কাজ করে না, বরং এ হল একাধিক উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি একটি জটিল আচরণ।
সূত্রঃ Popular Science; March 2026
