
সম্প্রতি গোথে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এক পুরনো রহস্যের সমাধান খুঁজছেন। অক্সিজেন ছাড়াই কীভাবে প্রাণের ভেতরে শক্তি তৈরির প্রক্রিয়া চালু থাকা সম্ভব সে বিষয়ে তাঁরা গবেষণা করেছেন । আমরা জানি প্রাণী, উদ্ভিদ এবং অন্যান্য জীব অক্সিজেন গ্রহণ করে খাবার (যেমন চিনি) ভেঙে কার্বন ডাই অক্সাইড ও জল তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় শক্তির একটি বিশেষ অণু (এটিপি) তৈরি হয়, যা কোষগুলির গুরুত্বপূর্ণ বিক্রিয়াগুলিকে শক্তি প্রদানের জন্য প্রয়োজন হয়।আমাদের এই গ্রহটির অস্তিত্বের প্রাথমিক পর্যায়ে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ছিল না। তবুও, সমুদ্রের তলদেশে উষ্ণ প্রস্রবণের মতো অক্সিজেন-হীন বাস্তুতন্ত্রে
তখনকার ব্যাকটেরিয়া টিকে ছিল। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, তারা অন্যভাবে শক্তি তৈরি করত। আজও কিছু ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে এটা দেখা যায়।এই গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে কলকারখানা ও গাড়ির ধোঁয়া থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড কমানোর উপায় বের করা সম্ভব হতে পারে।এই ব্যাকটেরিয়া কার্বন ডাই অক্সাইড ও হাইড্রোজেনকে অ্যাসিটিক অ্যাসিডে পরিণত করে শক্তি উৎপন্ন করে। বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন ব্যাকটেরিয়া এই কাজ কীভাবে করে, কিন্ত তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না এরা কীভাবে এটিপি তৈরি করে। গোথে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভলকার মুলার ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে এই ব্যাকটেরিয়া অ্যাসিটিক অ্যাসিড তৈরি করার সময় একটি বিশেষ কৌশলী প্রক্রিয়া চালু করে।এই প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া তার ভেতর থেকে সোডিয়াম আয়ন বাইরে বের করে দেয়। ফলে ভেতরে সোডিয়ামের পরিমাণ কমে যায়, আর ব্যাকটেরিয়ার বাইরের আবরণ একধরনের বাঁধের মতো কাজ করে।যখন এই বাঁধ খুলে দেওয়া হয়, তখন সোডিয়াম আয়ন আবার ভেতরে ঢোকে। এই প্রবাহ একটি ছোট্ট আণবিক মেশিনের (মলিকিউলার টারবাইন) মতো কাজ করে, যা এটিপি তৈরি করে।বিজ্ঞানীরা দেখেছেন,আরএনএফ সমাহার নামে কিছু বিশেষ প্রোটিন এই পুরো প্রক্রিয়াটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই প্রোটিনগুলো ব্যাকটেরিয়ার চারপাশের ঝিল্লির ভিতরে বসানো থাকে।অধ্যাপক মুলার জানিয়েছেন এই প্রোটিনগুলো এতই সংবেদনশীল যে বিজ্ঞানীরা মাত্র কয়েক বছর আগে এগুলো আলাদা করতে পেরেছেন। কার্বন ডাই অক্সাইড ও হাইড্রোজেন মিলে অ্যাসিটিক অ্যাসিড তৈরি করার সময় হাইড্রোজেনের ইলেকট্রন ধাপে ধাপে কার্বনের কাছে যায়। এই ধাপে আরএনএফ কমপ্লেক্স মধ্যস্থতাকারীর মতো কাজ করে। তারা ইলেকট্রন গ্রহণ করে পরবর্তী ধাপে পাঠিয়ে দেয়। গবেষক অনুজ কুমার ক্রায়ো-ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি নামে এক উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। তাঁরা অ্যাসিটোব্যাকটেরিয়াম উডি ব্যাকটেরিয়ার আরএনএফ কমপ্লেক্সকে হঠাৎ জমিয়ে ফেলে (শক-ফ্রিজিং) ছোট ছোট কণায় পরিণত করে তারপর একটি বাহক প্লেটে ফোঁটা ফোঁটা করে ফেলেন। এই প্রক্রিয়ায় একটি পাতলা বরফের স্তর তৈরি হয়, যেখানে লক্ষ লক্ষ আরএনএফ সমাহার থাকে। বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ দিয়ে এগুলো দেখেন ।বরফ তৈরি করার সময়, এই সমাহারগুলো প্লেটে ভিন্ন ভিন্ন দিকে পড়ে, তাই অণুবীক্ষণ যন্ত্রে সেগুলোর বিভিন্ন দিক স্পষ্টভাবে দেখা যায়। গবেষক অনুজ কুমার ও অন্যান্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ছবিকে একসঙ্গে মিলিয়ে একটি ত্রিমাত্রিক ছবি তৈরি করেছেন। এতে আরএনএফ সমাহারটির গঠন স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, বিশেষ করে যেসব অংশ ইলেকট্রন সরানোর কাজ করে।বিভিন্ন সময়ের ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই সমাহার একদম অনড় হয়ে থাকে না, বরং এটি দুলতে থাকে। এর ফলে, ইলেকট্রন বহনকারী অংশগুলো সহজেই দূরত্ব পেরিয়ে ইলেকট্রনগুলিকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানতে চেয়েছিলেন, ইলেকট্রন প্রবাহ কীভাবে সোডিয়াম আয়নকে বাইরে পাঠায়। স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কম্পিউটারে সিমুলেট করে দেখেছেন ব্যাকটেরিয়ার ঝিল্লির মাঝে লোহা ও গন্ধকের একটি বিশেষ অংশ আছে। যখন এটি ইলেকট্রন গ্রহণ করে, তখন এটি ঋণাত্মক আধান যুক্ত হয়ে যায়। ধনাত্মক আধান যুক্ত সোডিয়াম আয়ন এটাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে।এই আকর্ষণের ফলে ব্যাকটেরিয়ার কিছু প্রোটিন নড়াচড়া করে এবং এর ফলে ঝিল্লিতে একটি ছোট রাস্তা বা ছিদ্র তৈরি হয়। এই ছিদ্র দিয়েই সোডিয়াম আয়ন সহজে ব্যাকটেরিয়ার বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে। গবেষক রথ এই প্রক্রিয়াটি প্রমাণ করতে আরএনএফ প্রোটিনের জিনে কিছু পরিবর্তন করেন। এর ফলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে এই প্রক্রিয়ায় সোডিয়াম আয়ন বের হয়। এই আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণার মাধ্যমে। আরও চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এই ব্যাকটেরিয়াগুলো যখন অ্যাসিটিক অ্যাসিড তৈরি করে, তখন পরিবেশ থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে পারে।এর মানে, এগুলো প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশের কার্বন কমাতেও সাহায্য করে। এই ব্যাকটেরিয়া শিল্প কারখানার বর্জ্য গ্যাস থেকে ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস ( যেমন কার্বন ডাই অক্সাইড) কমাতে সাহায্য করতে পারে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের গতি ধীর করে দিতে পারে এবং একই সঙ্গে রাসায়নিক শিল্পের জন্য দরকারি উপকরণ তৈরি করতে পারে।এই গবেষণা একই রকমে শ্বাসযন্ত্রের এনজাইম সহ রোগজীবাণুগুলির বিরুদ্ধে নতুন ধরনের ওষুধ তৈরির পথও খুলে দিতে পারে।