জীববিজ্ঞানের অসংখ্য পাঠ্যবইয়ের একটি পরিচিত ছবি হল, একটি কোষকে মাঝখান থেকে কেটে ভেতরের গঠন দেখানো হয়েছে। যেন বাতাবি লেবু অর্ধেক করা। মাঝখানে ভাসছে নিউক্লিয়াস, তাকে ঘিরে এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম, রাইবোসোমে অপেক্ষায় আরএনএ, এদিকে-সেদিকে গলগি বডি আর ভ্যাকুওল। চারপাশে প্রায় ফাঁকা সাইটোসোল। ছবিটি এমন শান্ত, যেন কোষ একটি গোছানো কারখানা, যেখানে কর্মীরা যে যার কাজে ব্যস্ত। কিন্তু বাস্তব ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। কোষ মোটেও শান্ত নয়। একটি কোষের ভেতরে কেউ আটকে পড়লে, তার অনুভব হতে পারে যেন সে ভিড়ে ঠাসা খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে আছে—চারদিক থেকে অণুরা তাকে ধাক্কা মারছে । গত কয়েক বছরে উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তি ও জিন প্রকৌশলের অগ্রগতির দৌলতে বিজ্ঞানীরা প্রথমবার জীবন্ত দেহের কোষের ভেতরের এই ভিড় সরাসরি মাপতে পেরেছেন। দেখা গেছে, কোষের অভ্যন্তর আগে যা ভাবা গিয়েছিল চেয়ে অনেক বেশি ঘন ও গতিশীল। শুধু তা-ই নয়, কোষ নিজের ভেতরের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলি নিপুণভাবে সম্পন্ন হয়। প্রতিটি কোষে প্রতি সেকেন্ডে আনুমানিক এক বিলিয়ন জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। এত বিপুল সংখ্যক বিক্রিয়া ঘটা সম্ভব হয় কারণ অণুগুলি পরস্পরের কাছাকাছি থাকে। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন হেলথের কোষজীববিজ্ঞানী লিয়াম হল্ট মনে করেন, অণুদের এই ভিড় দরকার, কিন্তু অতিরিক্ত ভিড় আবার সমস্যাও তৈরি করতে পারে। ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত “জীবন কি? জীবন্ত কোষের পদার্থগত স্বরূপ” বইতে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানী এরভিন শ্রোডিঙ্গার বলেছিলেন, জীবন্ত সত্তাও পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মের অধীন। সেই ধারণাই আজ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, কোষের সাইটোপ্লাজমে না খুব কম ভিড়, না খুব বেশি ভিড় থাকে। ১৯৮০-র দশকে ব্যাঙের ডিম থেকে সংগৃহীত সাইটোপ্লাজম সামান্য পাতলা করতেই মাইটোসিস ও ডিএনএ প্রতিলিপিকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। আবার অতিরিক্ত ভিড়েও রাসায়নিক যন্ত্রপাতি স্থবির হয়ে পড়ে। কোষ তাই ক্রমাগত শক্তি ব্যয় করে ভেতরের তরলতা বজায় রাখে, যাতে অণুগুলি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে বিক্রিয়া ঘটাতে পারে। যদি কোষ কম ভিড়যুক্ত হতো, অণুগুলি এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়াত এবং সঙ্গী অণুর সঙ্গে খুব কমই দেখা হতো। আর অতিরিক্ত ভিড় হলে তারা নড়াচড়াই করতে পারত না। দীর্ঘদিন ধারণা ছিল, সাইটোসোলে রাইবোসোম প্রমুখ বড় অণু মোট আয়তনের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জুড়ে থাকে। কিন্তু তা যাচাই করার জন্য দরকার ছিল এমন এক সন্ধায়ক বা “ট্রেসার” অণু, যার আকার বড় অণুর সমান। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি হোল্ট তৈরি করেন জেনেটিকালি এনকোডেড মাল্টিমেরিক ন্যানোপার্টিকল, সংক্ষেপে জে ই এম এস—প্রায় ৪০ ন্যানোমিটার ব্যাসের এক গোলাকার প্রোটিন, যা আকারে রাইবোসোমের সমান। জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে সবুজ ফ্লুরোসেন্ট মার্কা লাগিয়ে মাইক্রোস্কোপে তাদের চলাচল দেখা যায়। ২০১৮ সালে ইস্ট ও মানবকোষে GEMs প্রবেশ করিয়ে দেখা যায়, পুষ্টির অবস্থা বদলালে কোষের ভিড়ও বদলে যায়। হোল্টের সন্দেহ পড়ে mTORC1-এর ওপর। এটি ইউক্যারিওটিক কোষের প্রধান পুষ্টি সেন্সর, যা কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। mTORC1 সক্রিয় হলে রাইবোসোমের উৎপাদন বাড়ে। গবেষণায় দেখা যায়, mTORC1 দমন করলে রাইবোসোম কমে যায় এবং GEMs সহজে চলাচল করে। অর্থাৎ রাইবোসোমই কোষের মধ্যে “প্রাকৃতিক ভিড় সৃষ্টিকারী।” এই ধারণা এক নতুন প্রশ্ন তোলে : জীবন্ত বহুকোষী প্রাণীর শরীরও কি একই নিয়মে চলে? বায়োফিজিসিস্ট জি. ডব্লিউ. গ্যান্ট লাক্সটন তা পরীক্ষা করতে চান। তিনি জিন তত্ত্ববিদ ড্যানিয়েল স্টার- এর সহায়তায় স্বচ্ছ কৃমি কাইনোরহ্যাবডাইটিস এলিগ্যান্স-এর মধ্যে GEMs প্রবেশ করান। ফল হল বিস্ময়কর। কৃমির কোষের সাইটোপ্লাজম প্রায় ৫০ গুণ বেশি ঘন, যা কালচার-করা মানবকোষের তুলনায় অনেক বেশি। GEMs প্রায় নড়াচড়াই করতে পারছিল না। যেন মধুর বদলে স্ট্রবেরি জ্যামের শিশিতে আটকে আছে। গবেষণাটি ২০২৫ সালে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস-এ প্রকাশিত হয়। তবে কোষের ভেতরের বড় স্ক্যাফোল্ডিং প্রোটিন ANC-1-এর কার্যকারিতা নষ্ট করে দিলে GEMs আবার নড়াচড়া শুরু করে। বোঝা যায়, কোষ শুধু রাইবোসোমের ঘনত্বকেই নয়, কাঠামোগত সংগঠনও বদলে দিয়ে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করে। লাক্সটন বলেন, “কোষকে একটি বাক্স ভাবলে, রাইবোসোম হবে চিনেবাদাম দিয়ে ঠাসা। ভিড় বদলাতে পারে চিনে বাদামের সংখ্যা বাড়িয়ে-কমিয়ে, আবার বাক্সের আকার বদলিয়ে।” এখন গবেষকেরা বিভিন্ন টিশু, এমনকি জেব্রাফিশ ও অর্গানয়েডে GEMs ব্যবহার করছেন। দেখা যাচ্ছে, সব কোষ একই মাত্রার ভিড় পছন্দ করে না। পেশীকোষ, চর্বিকোষ, স্নায়ুকোষ- প্রতিটির ভৌত চাহিদা আলাদা। এই গবেষণা কোষজীববিজ্ঞানে এক নতুন উপশাখার সূচনা করেছে। বায়োফিজিক্স, মাইক্রোস্কোপি ও জিন প্রকৌশল মিলিয়ে এখন কোষের ভেতরকার “ভিড়ের পদার্থবিদ্যা” উন্মোচিত হচ্ছে। লাক্সটনের কথায়, “যতবার আমরা নতুন টিশু দেখি, ততবারই অপ্রত্যাশিত কিছু পাই। যেন লুকোনো রত্ন ভান্ডারের ডালা খুলে গেছে।”
সূত্র: Quanta Magazine , February 18, 2026
