দীর্ঘদিন ধরে অণুর যে ‘ছবি’ আমরা দেখে অভ্যস্ত, তা বিজ্ঞানের কল্পনার ফসল। পাঠ্যবইয়ের পাতায় আঁকা গোলক আর রেখার নকশা। বিজ্ঞানীরা জানতেন অণুর গঠন কেমন। কিন্তু তা ছিল মূলত গাণিতিক হিসাব, রাসায়নিক পরীক্ষা এবং তাত্ত্বিক মডেলের উপর নির্ভরশীল এক ‘অনুমান’ মাত্র। সম্প্রতি শক্তিশালী কোয়ান্টাম মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এই প্রথম অণুর বাস্তব ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছেন। এই প্রযুক্তি এমন সংবেদনশীল যে একটি অণুর ভেতরে থাকা পৃথক পরমাণুগুলির অবস্থানও শনাক্ত করতে পারে। অর্থাৎ, প্রকৃতির সবচেয়ে ক্ষুদ্র গঠন এখন পর্যবেক্ষণযোগ্য বাস্তবতা। তবে ছবিগুলো সাধারণ ক্যামেরায় তোলা ছবি নয়। অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্ক্যানিং পদ্ধতির মাধ্যমে ছবিগুলি তৈরি। বিশেষ ধরনের স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ এবং অ্যাটমিক ফোর্স মাইক্রোস্কোপ অণুর পৃষ্ঠকে বিন্দু-বিন্দু করে স্ক্যান করে। স্ক্যানিংয়ের সময় যন্ত্রটি পরমাণুর চারপাশে ইলেকট্রনের আচরণ পরিমাপ করে। সেই সব তথ্য একত্র করে একটি মানচিত্র তৈরি করা হয়। সেখানে দেখা যায় অণুর প্রকৃত কাঠামো। যে ছবিগুলো এতদিন ঝাপসা ঝাপসা বা বিমূর্ত মনে হত, সেগুলো আসলে অণুর ভেতরের ইলেকট্রন-বিন্যাসেরই সূক্ষ্ম প্রতিচ্ছবি। এই ছবির পাশেই বিজ্ঞানীরা তাত্ত্বিক মডেলের পরিষ্কার ছকটিও দেখান। এগুলির সাহায্যে বোঝানো হয়, অণুর ভেতরে পরমাণুগুলো ঠিক কী ছাঁদে সাজানো রয়েছে। এই প্রযুক্তি রসায়ন ও উপাদানবিজ্ঞানে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। আগে বিজ্ঞানীরা শুধু অনুমান করতে পারতেন অণুগুলো কীভাবে বন্ধন তৈরি করে বা রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। এখন তারা প্রায় সরাসরি দেখতে পাচ্ছেন, আসলে কীভাবে দুটি অণু কাছে আসে, কীভাবে বন্ধন গড়ে তোলে কিংবা কীভাবে একটি ছোট পরিবর্তন পুরো উপাদানের বৈশিষ্ট্য বদলে দিতে পারে। এই জ্ঞান নতুন ওষুধ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট অণুর গঠন বুঝতে পারলে আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ বানাতে পারবেন। একইভাবে উন্নত ইলেকট্রনিক উপাদান, শক্তিশালী নতুন পদার্থ কিংবা আরও দক্ষ শক্তি-প্রযুক্তি তৈরির পথও খুলে যাবে। আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে মানে আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই, যে জল পান করি, এমনকি আমাদের শরীরও- সবকিছুই তৈরি অসংখ্য অণু দিয়ে। একটি মানুষের চুলের প্রস্থের মধ্যেও অগণিত অণু বসানো সম্ভব! যা প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হয়। প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, বিজ্ঞানীরা তত জটিল অণু এবং রাসায়নিক বিক্রিয়াও পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। প্রতিটি নতুন ছবি যেন প্রকৃতির রহস্যময় নির্মাণশালার এক একটি নতুন জানালা খুলে দেয়।
সূত্র: Trendora
