অন্ত্রের অণুজীবমণ্ডলে রাসায়নিক হানা

অন্ত্রের অণুজীবমণ্ডলে রাসায়নিক হানা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৭ জানুয়ারী, ২০২৬

মানুষের প্রাত্যহিক আধুনিক জীবনযাত্রা এমন এক রাসায়নিক জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যার প্রভাব আমাদের অন্ত্রে বসবাসকারী উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ওপর গিয়ে পড়ছে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক বিস্তৃত গবেষণা জানাচ্ছে, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বহু রাসায়নিক পদার্থ মানব অন্ত্রের সুস্থ মাইক্রোবায়োমকে/অণুজীবীয় বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

গবেষকেরা পরীক্ষাগারে ১,০৭৬টি কৃত্রিম রাসায়নিক ২২ ধরণের প্রজাতির আন্ত্রিক ব্যাকটেরিয়ার ওপর প্রয়োগ করেছেন। এর মধ্যে ১৬৮টি রাসায়নিক স্পষ্টভাবে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ও কার্যক্ষমতা দমন করে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই রাসায়নিকগুলোর অনেকটাই আমাদের কাছে ক্ষতিকারক নয় বলেই পরিচিত, সেগুলি খাদ্য, পানীয় জল ও পরিবেশের মাধ্যমে নিয়মিত আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে।

ক্ষতিকর তালিকায় রয়েছে কীটনাশক ও আগাছানাশক, যা কৃষিজ ফসলে ব্যবহৃত হয়, পাশাপাশি শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত ফ্লেম রিটার্ডেন্ট ও প্লাস্টিক সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক। এতদিন এসব পদার্থকে জীবন্ত কোষের ওপর প্রায় নিষ্ক্রিয় বলে মনে করা হলেও, গবেষণাটি দেখিয়েছে যে এগুলো অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে কার্যত নিঃশব্দে দমন করে।

মানব অন্ত্রে প্রায় ৪,৫০০ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া একসঙ্গে কাজ করে হজম, রোগপ্রতিরোধ, বিপাক এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যের ভারসাম্য রক্ষা করে। এই সূক্ষ্ম বাস্তুতন্ত্রে ব্যাঘাত ঘটলে ডায়াবেটিস, স্থূলতা, অন্ত্রের রোগ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্বলতা প্রভৃতি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এই গবেষণার আরেকটি গুরুতর দিক হলো, কিছু রাসায়নিকের প্রভাবে ব্যাকটেরিয়া সিপ্রোফ্লক্সাসিনের মতো প্রভাবশালী অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে। যদি মানবদেহের ভেতরেও একই রকম প্রতিক্রিয়া ঘটে, তাহলে ভবিষ্যতে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসা পদ্ধতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে গবেষকেরা একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস মডেল তৈরি করেছেন। এটি নতুন রাসায়নিক ব্যবহারের আগেই অন্ত্রে থাকা ব্যাকটেরিয়ার ওপর সেগুলোর সম্ভাব্য প্রভাব নির্ণয়ে সহায়ক হবে। বিজ্ঞানীদের মতে, সময় এসেছে রাসায়নিক নিরাপত্তা পরীক্ষার সংজ্ঞা নতুন করে ভেবে দেখার। যেখানে মানুষের পাশাপাশি অন্ত্রের অণুজীব গোষ্ঠীর সুরক্ষাও সমান গুরুত্ব পাবে।

যদিও গবেষণাটি পরীক্ষাগারে পরিচালিত, তবুও বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, বাস্তব জীবনে আমরা নিয়মিতই এই রাসায়নিকগুলোর সংস্পর্শে আসছি। আপাতত ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঝুঁকি কমাতে ফল ও সবজি বাজার থেকে আনার পর ভালোভাবে ধোয়া, ভালো করে গরমজলে সেগুলোকে বেশ খানিকক্ষণ ফোটানো এবং বাড়িতে অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন গবেষকেরা। স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নে এখন আমাদের শুধু দৃশ্যমান ক্ষতির দিকেই নয়, শরীরের ভেতরের অদৃশ্য সহযাত্রীদের প্রতিও নজর দিতে হবে।

 

সূত্র: “Industrial and agricultural chemicals exhibit antimicrobial activity against human gut bacteria in vitro” by Indra Roux, Anna E. Lindell, et.al; 26th November 2025, published in Nature Microbiology.

DOI: 10.1038/s41564-025-02182-6

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − five =