অপ্রতিদ্বন্দ্বী বোল্টসম্যান সূত্র 

অপ্রতিদ্বন্দ্বী বোল্টসম্যান সূত্র 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

উনিশ শতকে অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ লুডভিগ বোল্টসম্যান প্রস্তাব করেছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের এক মৌলিক সূত্র, যার নাম বোল্টসম্যান বণ্টন। বিশৃঙ্খলার মাঝেও প্রকৃতি যে গভীর শৃঙ্খলা মেনে চলে, তার অন্যতম প্রমাণ এই বোল্টসম্যান বণ্টন। বাতাসে ছুটে চলা অণু থেকে শুরু করে তাপ, শক্তি ও সম্ভাবনার জগৎ—সবখানেই দুই শতাব্দী ধরে এটি পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু প্রশ্ন ছিল—এটাই কি একমাত্র সম্ভাব্য নিয়ম? নাকি এর বিকল্পও হতে পারে?

সম্প্রতি এই প্রশ্নেরই চূড়ান্ত উত্তর খুঁজে পেয়েছেন ক্যালটেকের ওমের তামুজ এবং প্রিন্সটনের ফেদর স্যান্ডোমিরস্কি। দু’জনেই অর্থনীতিবিদ, কিন্তু তাঁদের গবেষণার শিকড় গাঁথা পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতে। তাঁদের সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে, স্বাধীন ও পরস্পর সম্পর্কহীন সিস্টেমকে বাস্তবসম্মতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে একমাত্র এই বোল্টসম্যান বণ্টন। এর কোনো বিকল্প বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে তাঁরা প্রমাণস্বরূপ ব্যবহার করেছেন এক অদ্ভুত ধারণার। যার নাম- “সিকারম্যান বা ক্রেজি ডাইস”। গণিতে “Crazy dice” বলতে সাধারণত বোঝায় সিকারম্যান ডাইস— যা একটি অপ্রচলিত বা অস্বাভাবিক সংখ্যাযুক্ত ছয়-পিঠের / ৬ মুখবিশিষ্ট পাশার একটি জোড়া। এই ঘনক গুলোর গায়ে সাধারণ ১ থেকে ৬ পর্যন্ত সংখ্যা নেই। বরং সংখ্যা বসানো হয়েছে একেবারেই অস্বাভাবিকভাবে। তবু আশ্চর্যের বিষয় , দুটি ঘনককে একসঙ্গে ফেললে যোগফলের সম্ভাবনা ঠিক সাধারণ ঘনকের মতোই থাকে। বাহ্যত অস্বাভাবিক হলেও এই ঘনকগুলো সাধারণ ঘনকের মতোই সম্ভাব্য ফল দেয়। এই উদাহরণ থেকেই গবেষকেরা দেখান, কোনো তত্ত্ব যদি স্বাধীনতার মৌলিক শর্ত ভাঙে, তবে তা প্রকৃতিকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না। এক্ষেত্রে গবেষকেরা একটি প্রশ্ন তুলেছেন: যদি দুটি সিস্টেম সত্যিই স্বাধীন হয়, তাহলে তাদের আচরণ বর্ণনার সময় কি এমন কোনো নিয়ম গ্রহণ করা যায়, যা কৃত্রিম বা অযৌক্তিক সম্পর্ক তৈরি করে? তাঁদের গাণিতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক বিকল্প তত্ত্ব এই পরীক্ষায় ব্যর্থ । সেগুলো স্বাধীন সিস্টেমের মধ্যে এমন সংযোগ তৈরি করে, যা বাস্তবে থাকার কথা নয়—ঠিক যেমন ভুলভাবে নম্বর দেওয়া ঘনক দিয়ে অদ্ভুত ফল পাওয়া।

এই ফলাফলটি কিন্তু শুধুমাত্র পদার্থবিজ্ঞানের জন্যই নয়, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান ও তথ্যতত্ত্বসহ যেকোনো ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য গভীর। যেখানেই বহু স্বাধীন উপাদানের সম্মিলিত আচরণ বিশ্লেষণ করা হয়, সেখানেই ।

মোটকথা এই “খ্যাপা ছক্কা”–নির্ভর গণিতিক প্রমাণ আবারও নিশ্চিত করল যে, উনিশ শতকে লুডভিগ বোল্টসম্যান যে সূত্র প্রস্তাব করেছিলেন, সেটিই আজও প্রকৃতি ও জটিল সিস্টেম বোঝার ক্ষেত্রে একমাত্র সঙ্গত ও মৌলিক নিয়ম। প্রকৃতির সবচেয়ে মৌলিক নিয়মগুলো পুরোনো হলেও, সেগুলিই আজও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

 

সূত্র: California Institute of Technology / Mathematische Annalen (2025)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 5 =