অপ্রিয় সত্যভাষী বিজ্ঞানী ভেঙ্কটরামণ রামকৃষ্ণন

অপ্রিয় সত্যভাষী বিজ্ঞানী ভেঙ্কটরামণ রামকৃষ্ণন

আশীষ লাহিড়ী
Posted on ৩১ জানুয়ারী, ২০২৫

ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণণ (জন্ম ১৯৫০) ইদানীং বিজ্ঞানের জ্যোতিষ্কজগতে এক উজ্জ্বল ভারতীয় নক্ষত্র (জন্মসূত্রে ভারতীয়, নাগরিকত্বে মার্কিন-ব্রিটিশ)। ২০০৯ সালে রাইবোসোমের গঠনকাঠামো এবং ক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করে তিনি রসায়নে নোবেল পান টমাস স্টেইট্‌জ আর এডা ইয়োনাথ-এর সঙ্গে। ২০১৫-২০২০ পর্বে তিনি ছিলেন রয়্যাল সোসাইটির সভাপতি। তাঁর বাবা-মা দুজনেই বিজ্ঞানী। শৈশবের লেখাপড়া বরোদায়। সেখানকার প্রসিদ্ধ সয়াজীরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে বি এস-সি পাশ করে তিনি চলে যান আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ওহায়ো বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখান থেকে ১৯৭৬এ ডক্টরেট করেন। এর পর, তিনি ঘুরে গেলেন জীববিজ্ঞানের দিকে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবার স্নাতক হলেন, এবার জীববিজ্ঞানে। সেই থেকে এক নাগাড়ে আর এন এ আর প্রোটিনে গড়া রাইবোসোম নিয়ে কাজ করে চলেছেন, যা কিনা কোষের মধ্যে প্রোটিন সংশ্লেষণের ক্ষেত্র। নানা বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে ১৯৯৫ সালে তিনি থিতু হলেন কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল-এর আণবিক জীববিজ্ঞান ল্যাবরেটরিতে। তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির কারণ হিসেবে নোবেল কমিটি বলে: ‘জীবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রিয়াসমূহ চালিত হয় কতকগুলি মস্ত মস্ত, জটিল গড়নের প্রোটিন অণুর ব্যবস্থাপনায়, যেগুলি তৈরি হয় কোষের রাইবোসোমের মধ্যে। সেখানে “বার্তাবহ আর এন এ” থেকে জিন সংক্রান্ত তথ্যাদি রূপান্তরিত হয় অ্যামিনো অ্যাসিডের শৃঙ্খলে। অতঃপর সেই সব অ্যামিনো অ্যাসিড-শৃঙ্খল প্রোটিন তৈরি করে। এক্স রে ক্রিস্টালোগ্রাফির পদ্ধতি অনুসরণ করে ২০০০ সালে ভেঙ্কটরামন রামকৃষ্ণণ এবং অন্য গবেষকদের সহযোগিতায় লক্ষ লক্ষ পরমাণু দ্বারা গঠিত রাইবোসোমের গঠনকাঠামোর একটি মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হয়। এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপযোগিতার মধ্যে একটি হল অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন’। রয়্যাল সোসাইটি তাঁর সম্বন্ধে বলে: ‘৩০ এস রাইবোসোমাল উপ-এককের পারমাণবিক গঠনকাঠামো নির্ণয়ের জন্য রামকৃষ্ণণ বিশ্বপ্রসিদ্ধ। তার আগে তিনি নিউট্রন ডিফ্র্যাকশনের সাহায্যে ৩০ এস রাইবোসোমাল উপ-এককের মধ্যে প্রোটিনগুলি কীভাবে সাজানো থাকে তার মানচিত্র নির্ণয় করেছিলেন এবং স্বতন্ত্র অংশগুলির ও তাদের আর এন এ সমাহারের এক্স রে কাঠামোর সমস্যা সমাধান করেছিলেন। পূর্ণাঙ্গ ৩০ এস উপ-একক বিষয়ে তাঁর গবেষণা এ বিষয়টির উপর মৌলিক আলোকপাত করেছে। পারমাণবিক মডেলটির মধ্যে ছিল ১৫০০টিরও বেশি আর এন এ ‘বেস’ এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কুড়িটি প্রোটিন’।

ভেঙ্কটরামণ মানুষটি নম্রভাষী, কিন্তু সত্যভাষণে অকুণ্ঠ, সে-সত্য অপ্রিয় হলেও। ২০১৬য় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বক্তৃতায় ভেঙ্কি বলেন, ভারত কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে, কিন্তু বহু ভারতীয় আজও কুসংস্কারের ঢিপি, যার ফলে সিদ্ধান্তগ্রহণে বিশ্রি রকমের ভুল হয়ে যায়। ভারতের কৃতিত্ব-মুকুটের নবতম পালক ‘মঙ্গলযান’ উৎক্ষেপণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মঙ্গলবার দিনটা পয়া বলেই যানটা মঙ্গলবার উৎক্ষেপ করা হয়েছিল শুনে তিনি আকাশ থেকে পড়েছিলেন। “আমি যদি ওই পদে থাকতাম, আমি তো উৎক্ষেপণের ২৪ ঘণ্টা আগে থেকে ওখান থেকে নড়তামই না।” ২০১৫ সালের ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে জনৈক অংশগ্রহণকারী জানিয়েছিলেন, উড়োজাহাজ জিনিসটা নাকি বৈদিক যুগের কোনো ঋষির আবিষ্কার। এ প্রসঙ্গে ভেঙ্কির মন্তব্য: ‘ভারতীয়রা ২০০০ বছর আগে উড়োজাহাজ বানাত, এটা আমার প্রায় সর্বৈব অসম্ভব বলে মনে হয়। আমি এটা বিশ্বাস করি না। কথাটা এই যে, ওই প্রযুক্তি যদি এমন এক পদ্ধতি অনুসারে উৎপন্ন হত যার বিবরণ থেকে অন্য কেউ উড়োজাহাজ বানাতে পারত, তাহলে ওটাকে বিজ্ঞান বলা যেত।’ ২০১৫র ডিসেম্বরে মৈসুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উপলক্ষে দেওয়া এক বক্তৃতায় রামকৃষ্ণণ বলেছিলেন, ভারতীয় সমাজকে কুসংস্কারের পথ বর্জন করে যুক্তিশীল সমাজ হয়ে উঠতে হবে। ‘আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলি যে পশ্চিম ইউরোপেই বিকশিত হল আর তারই সুবাদে ঘটাল শিল্প বিপ্লব, গড়ে তুলল আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা, সেটা তো আর হঠাৎ করে ঘটেনি। গত দুশো বছরে ওইসব দেশ, আর সেই সঙ্গে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, … নাটকীয় হারে অগ্রগতি ঘটিয়েছে। আর অন্য যেসব দেশ বৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণার সঙ্গে নিজেদের অন্বয় ঘটাতে পারেনি, তারা কিন্তু যেখানে ছিল সেই কূপেই আটকা পড়ে গেল।’ ২০১৫য় ভারতের বিজ্ঞান কংগ্রেসের রঙ্গ দেখে ‘অবাক মেনে’ ক্রুদ্ধ ভেঙ্কি বলেছিলেন, ‘এটা তো একটা সার্কাস। এখানে রাজনীতির চর্চা হয়, ধর্মের চর্চা হয়, বিজ্ঞানের চর্চা হয় না। আমি জীবনে কোনো দিন আর বিজ্ঞান কংগ্রেসে আসব না।’ তিনি লক্ষ্য করেছেন, ভারতের সংবিধানেই রয়েছে ‘বিজ্ঞানমনস্কতা’ (সাইন্টিফিক টেম্পার) গড়ে তোলার সংকল্পর কথা। কিন্তু ভারতীয় সমাজের একটা বিরাট অংশ সেই শুভ সংকল্পকে বাস্তবায়িত করার বদলে তার বিপরীত মেজাজ গড়ে তোলার জন্য সদা ব্যস্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × one =