অম্বলের ওষুধ ক্যানসার ঘটায় না 

অম্বলের ওষুধ ক্যানসার ঘটায় না 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

বদহজম, গলা-বুকজ্বালা ও পেপটিক আলসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর ওষুধগুলো বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও প্রেসক্রাইব করা ওষুধের মধ্যে অন্যতম। প্রোটন পাম্প প্রতিরোধক ওষুধ পাকস্থলীর কোষে থাকা “প্রোটন পাম্প” নামক উৎসেচককে বাধা দিয়ে অ্যাসিড নিঃসরণ কমায়। তবে গত কয়েক দশক ধরে এই ওষুধ দীর্ঘদিন ধরে সেবনের ফলে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ছে কিনা — তা নিয়ে রোগী থেকে চিকিৎসক সবার মনেই ছিল একরাশ সংশয়। সাম্প্রতিক এক বড় বৈজ্ঞানিক গবেষণা সেই আশঙ্কার ওপর অনেকটাই ইতি টানল।

বি এম জে-তে প্রকাশিত উত্তর ইউরোপ-কেন্দ্রিক এই গবেষণায় স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে, প্রোটন পাম্প ইনহিবিটরের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় না। কোটি কোটি মানুষের জন্য এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। কারণ, যে ওষুধ প্রতিদিনের যন্ত্রণাকে প্রশমিত করে, সেটিই যদি ভবিষ্যতের বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াত, তাহলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর আস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ত। শুধু তাই নয়, এ ফলাফল চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও আত্মবিশ্বাস জোগাবে।

এই বিতর্কের শিকড় অনেক পুরোনো। ১৯৮০–এর দশক থেকেই পাকস্থলীর অ্যাসিড দীর্ঘদিন দমন করলে তার জৈবিক প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। পরবর্তী কয়েক দশকে কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল, প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর ব্যবহারকারীদের মধ্যে পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেই গবেষণাগুলোতে একটি মৌলিক সমস্যা ছিল—অনেক ক্ষেত্রেই ক্যানসারের ঝুঁকি- বাড়ানো পূর্ববর্তী রোগ, সংক্রমণ বা জীবনযাপনজনিত কারণকে আলাদা করে দেখা হয়নি। ফলে কারণ ও কাকতালীয় সম্পর্ক গুলিয়ে গেছে।

এই অস্পষ্টতা দূর করতেই গবেষকেরা উত্তর ইউরোপের পাঁচটি দেশ- ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইডেনের ১৯৯৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ২৬ বছরের জাতীয় স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল ১৭ হাজারের বেশি পাকস্থলীর ক্যানসার রোগী এবং প্রায় দেড় লক্ষেরও বেশি সুস্থ মানুষ। বয়স, লিঙ্গ ও দেশের ভিত্তিতে তুলনা করে গবেষণাকে যতটা সম্ভব নির্ভুল করার চেষ্টা করা হয়েছে।

গবেষণায় এক বছরের বেশি সময় প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর ও হিস্টামিন–২ রিসেপ্টর অ্যান্টাগোনিস্ট (আরেক ধরনের অ্যাসিড কমানোর ওষুধ) ব্যবহারের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়। ক্যানসারের প্রাথমিক উপসর্গের কারণে ওষুধ ব্যবহার বেড়ে যেতে পারে—এই বিভ্রান্তি এড়াতে রোগ নির্ণয়ের আগের ১২ মাসের ওষুধ গ্রহণ হিসাবের বাইরে রাখা হয়।

এছাড়া বয়স, লিঙ্গ, হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরাই সংক্রমণ, আলসারের ইতিহাস, ধূমপান ও মদ্যপানজনিত রোগ, স্থূলতা, ডায়াবেটিসসহ গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিগুলো হিসাবের মধ্যে আনা হয়। সব দিক বিবেচনায় ফলাফল একটাই বলছে—প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর বা অনুরূপ অ্যাসিড-নিয়ন্ত্রক ওষুধ দীর্ঘদিন সেবনের সঙ্গে পাকস্থলীর ক্যানসারের কোনো নির্ভরযোগ্য যোগসূত্র নেই।

এটি একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা। খাদ্যাভ্যাস বা পারিবারিক ইতিহাসের মতো কিছু বিষয় পুরোপুরি বিবেচনায় আনা সম্ভব হয়নি। তাই সব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো মেলেনি। তবু গবেষকদের মতে এত বড় পরিসরের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য আগের গবেষণার বহু ত্রুটি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে।

মোটকথা বুকজ্বালার ওষুধের নিরাপত্তা নিয়ে যে ভয় বহু বছর ধরে রোগী ও চিকিৎসকদের মনে দানা বেঁধেছিল, এই গবেষণা তা অনেকটাই দূর করেছে। যাঁদের দীর্ঘদিন প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর চিকিৎসা প্রয়োজন, তাঁদের জন্য এই ওষুধ আগের মতোই নিরাপদ। তাই পাকস্থলীর ক্যানসারের ভয় পেয়ে অযথা চিকিৎসা বন্ধ করার প্রয়োজন নেই।

 

সূত্র: “Long term use of proton pump inhibitors and risk of stomach cancer: population based case-control study in five Nordic countries” by Onyinyechi Duru, Giola Santoni, 21st January 2026, BMJ.

DOI: 10.1136/bmj-2025-086384

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 + 6 =