অসুস্থ হলেই কেন যেন আমাদের খাওয়াদাওয়ার প্রতি একটা অনীহা তৈরি হয়। কিন্তু কী কারণে এইপ্রকার অনুভূতি হয় তার কোনোপ্রকার ব্যাখ্যাই আমাদের জানা ছিল না। সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রানসিসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই বিশেষ জৈবিক প্রক্রিয়াটির কারণের উপর আলোকপাত করেছেন। তাঁদের এই বিশেষ গবেষণাটির সম্পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে নেচার জার্নালে (২৫ মার্চ, ২০২৬)। এটি আমাদের শরীরের অন্ত্র-মস্তিষ্ক সংযোগ সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।
দেখা গেছে, আমাদের অন্ত্র শুধুই যে হজমে সহায়তা করে এমন নয়। এ এক বিশেষ অনুভূতিশীল অঙ্গ। অন্ত্রে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বুদ্ধিদীপ্ত সতর্কবার্তার ব্যবস্থা রয়েছে। শরীরে পরজীবী সংক্রমণ ঘটলে, অন্ত্রের এক বিশেষ ধরনের কোষ—টাফ্ট সেল—প্রথমে সেই আক্রমণ শনাক্ত করে। এরপর তারা অনাক্রম্য তন্ত্রকে সক্রিয় করার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক সংকেত হিসেবে অ্যাসিটাইলকোলিন নিঃসরণ করে। আশ্চর্যের বিষয়, এই রাসায়নিকটি সাধারণত স্নায়ুকোষের মাধ্যমে ব্যবহৃত হলেও এখানে অন্ত্রের কোষই তা ব্যবহার করছে।
এই সংকেত পৌঁছে যায় আরেক ধরনের কোষে—এন্টারোক্রোমাফিন (EC) সেলে। প্রতিক্রিয়ায় এই কোষগুলো সেরোটোনিন নিঃসরণ করে, যা ভেগাস নার্ভের মাধ্যমে সরাসরি মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। ফলত মস্তিষ্ক খাবারের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয়, অর্থাৎ ক্ষুধার অনুভূতিটাই হঠাৎ করে উবে যায়।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—এই সংকেত পাঠানোর প্রক্রিয়াটি তাৎক্ষণিক নয়, এটি ঘটে ধীরে ধীরে , ধাপে ধাপে ঘটে। প্রথমে টাফ্ট সেলগুলো অল্প সময়ের জন্য সংকেত দেয়, কিন্তু সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা দীর্ঘস্থায়ীভাবে সংকেত ছাড়তে শুরু করে। এর ফলে শুরুতে মানুষ স্বাভাবিক বোধ করলেও, কিছু সময় পরে হঠাৎ করেই আর খিদে পায় না। অর্থাৎ, শরীর নিশ্চিত হয় যে সংক্রমণটি গুরুতর, তারপরই মস্তিষ্ককে আচরণ পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়।
প্রাণী পরীক্ষায় এই তত্ত্বের দৃঢ় প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেসব ইঁদুরের শরীরে এই সংকেত ব্যবস্থা অক্ষত ছিল, তারা সংক্রমণের সময় স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম খেয়েছে। অন্যদিকে, যাদের টাফ্ট সেল অ্যাসিটাইলকোলিন তৈরি করতে পারেনি, তাদের খাওয়ার অভ্যাসে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
এই আবিষ্কার শুধু একটি উপসর্গের ব্যাখ্যা নয়, বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য একটি নতুন দিশা। গবেষকেরা মনে করছেন, এই অন্ত্র- মস্তিষ্কের সিগন্যালিং ব্যবস্থার অসামঞ্জস্যই হয়তো ইরিটেবেল বাওয়েল সিনড্রোম, খাদ্য অসহিষ্ণুতা বা দীর্ঘস্থায়ী অন্ত্রজনিত ব্যথার মতো সমস্যার পেছনে ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যতে যদি এই সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে খিদে কমে যাওয়া থেকে শুরু করে নানা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যার চিকিৎসায় এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেতে পারে।
সূত্র: Nature, 28th March 2026.
