“অ্যান্টস্ক্যান’’ : পিপীলিকা আর্কাইভ  

“অ্যান্টস্ক্যান’’ : পিপীলিকা আর্কাইভ  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৭ মার্চ, ২০২৬

পৃথিবীর সবচেয়ে সফল প্রাণীগুলোর মধ্যে সামনের সারিতে রয়েছে পিঁপড়ে। বন, মরুভূমি, শহর, রান্নাঘর সব জায়গাতেই এরা আস্তানা গড়ে। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, এমন সফল একটি প্রাণীর শরীরের ভেতরের গঠন নিয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘকাল পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছিল না। ক্ষুদ্র আকারের কারণে হাজার হাজার পিঁপড়ের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। এবার সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে এক বিশাল ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ২,২০০টি সংরক্ষিত পিঁপড়ের নমুনা স্ক্যান করে তারা তৈরি করেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ত্রিমাত্রিক পিঁপড়ে অ্যানাটমি আর্কাইভ। প্রায় ৮০০ প্রজাতির পিঁপড়ের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল দেহের গঠনের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে এই সংগ্রহে, যা স্তর ধরে খুলে দেখা যায়। এই বিশাল সংগ্রহের নাম “অ্যান্টস্ক্যান’’ (Antscan)।

এখানে পিঁপড়ের পেশি, স্নায়ু, পরিপাকতন্ত্র, এমনকি হুল পর্যন্ত সবকিছু স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ফলে পৃথিবীর নানা প্রজাতির পিঁপড়ের শরীর কীভাবে গঠিত, আর বিবর্তনের পথে তাদের দেহে কী কী পরিবর্তন ঘটেছে, তা বিজ্ঞানীরা তুলনা করতে পারছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের গবেষকেরা দেখিয়েছেন, সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত ছোট ছোট পিঁপড়ে বা পোকামাকড়ের নমুনাগুলোকে একত্র করে এখন এমন বিশ্ব অ্যানাটমি রেকর্ড তৈরি করা সম্ভব। আগে এসব নমুনা বিভিন্ন সংগ্রহে ছড়িয়ে ছিল, আর প্রতিটিকে বিশদে পরীক্ষা করা ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ কাজ। কারণ পোকামাকড়ের সূক্ষ্ম স্ক্যান করার প্রক্রিয়া খুব ধীর ছিল। জার্মানির এক সিঙ্ক্রোট্রন এক্স-রে এক ধরনের কণাত্বরণ যন্ত্র। সেটি অত্যন্ত শক্তিশালী এক্স-রে তৈরি করে। সেখানে রোবট ব্যবহার করে প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একটি করে নমুনা বদলে চলা হয়। ফলে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৫টি এবং সপ্তাহে প্রায় ২,০০০ পিঁপড়ে স্ক্যান করা গেছে। একটি সাধারণ ল্যাব স্ক্যানার দিয়ে একই কাজ করতে গেলে সময় লাগত, ছয় বছর বা তারও বেশি। এক্ষেত্রে গবেষকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো অদ্ভুত বা বিরল পিঁপড়ে বেছে নেননি। বরং পুরো পিঁপড়ে পরিবারের যতটা সম্ভব প্রতিনিধিত্ব থাকে, এমন বিস্তৃত একটি সমীক্ষা তৈরি করেছেন। শেষ পর্যন্ত এই লাইব্রেরিতে জমা হয়েছে ২,১৯৩টি সম্পূর্ণ শরীরের ডেটাসেট। এগুলো এসেছে ২১২টি গণ এবং অন্তত ৭৯২টি প্রজাতি থেকে। শুধু শ্রমিক পিঁপড়ে নয়, রানি ও পুরুষ পিঁপড়েও এতে রয়েছে। এমনকি তুলনার সুবিধার জন্য ৩২টি বোলতার স্ক্যানও যুক্ত করা হয়েছে। ২১২টি গণ মিলিয়ে পৃথিবীতে বর্ণিত পিঁপড়ে প্রজাতির ৯০ শতাংশেরও বেশির স্ক্যান সম্পন্ন করা গেছে। স্ক্যান করার সময় পিঁপড়েগুলোকে ইথানলে সংরক্ষিত অবস্থাতেই রাখা হয়েছিল। মাইক্রো-সিটি স্ক্যান প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা শুধু শক্ত বহিঃকঙ্কালই নয়, শরীরের নরম অঙ্গগুলোও দেখতে পেয়েছেন। যেমন পেশি, স্নায়ু, পরিপাকনালী এবং হুলের গঠন। তবে সংগ্রহশালার পুরোনো নমুনাগুলোর ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক নমুনায় নরম কোষকলা নষ্ট হয়ে গেছে বা সংকুচিত হয়েছে। আবার অনেক পিঁপড়ে সংরক্ষণ বোতলের ভেতরে অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে ছিল। ফলে ডিজিটাল স্ক্যানেও তাদের দেহ অদ্ভুত ভঙ্গিতে দেখা যাচ্ছিল। এই সমস্যার সমাধানে ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের সফটওয়্যার প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা তৈরি করছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক “পোজ এস্টিমেশন’’ সফটওয়্যার। এর কাজ হলো স্ক্যান করা নমুনা দেখে অনুমান করা, পিঁপড়েটির স্বাভাবিক ভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত। যদি এই প্রযুক্তি সফল হয়, তবে পিঁপড়ের ডিজিটাল মডেলগুলোকে সহজেই প্রাণিত করা যাবে। শুধু গবেষণাগার জন্য নয়, শিক্ষা, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি এমনকি সিনেমা ও অ্যানিমেশন শিল্পেও এগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হবে। গবেষকেরা ইতিমধ্যে এই আর্কাইভ ব্যবহার করে নতুন তথ্য বের করতে শুরু করেছেন।

একটি গবেষণায় ৫০৭টি প্রজাতির পিঁপড়ের বহিঃকঙ্কালের পুরুত্ব, যাকে ‘কিউটিকল’ বলা হয়, তারও পরিমাপ করা হয়। কিউটিকল তৈরি করতে নাইট্রোজেন ও খনিজ লাগে। ফলে যদি কোনো পিঁপড়ের বর্ম পাতলা হয়, তাহলে পিঁপড়ের বসতি সেই খোলস ব্যবহার করতে পারে, যাতে আরও বেশি শ্রমিক পিঁপড়ে তৈরি হয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব প্রজাতির শ্রমিক পিঁপড়ে নিজেদের সুরক্ষায় কম উপাদান ব্যবহার করে, তাদের বসতি সাধারণত বড় হয়। অর্থাৎ অনেক সময় ব্যক্তিগত শক্তির চেয়ে সমষ্টিগত শক্তিই বেশি কার্যকর। এই ফাইলগুলো অবাধে ডাউনলোড করা যাবে। এমনকি একটি বিল্ট-ইন ভিউয়ার দিয়ে এদের দেখাও যায়। ফলে শিক্ষক, শিল্পী, অ্যানিমেটর – যে কেউ পিঁপড়ের অ্যানাটমি অন্বেষণ করতে পারবেন, সংগ্রহশালার ড্রয়ার না খুলেই। এই গবেষণার আরেক লক্ষ্য হল, এই অ্যানাটমি ডেটাকে ডিএনএ তথ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করা। অ্যান্টস্ক্যানের মধ্যে ইতিমধ্যে ১৮৬টি প্রজাতির স্ক্যান জিনোমিক ডেটার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৫৭টি একই বাসা থেকে সংগৃহীত নমুনা। জিনের পরিবর্তনের সঙ্গে চোয়াল, বর্ম বা শরীরের আকারের পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা তা এবার বোঝা যাবে। অবশ্য প্রকল্পটির সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ক্ষণস্থায়ী ডেটা ও সর্বজনের ব্যবহার্য প্রকাশিত ফাইল মিলিয়ে ইতিমধ্যে ২০০ টেরাবাইটের বেশি তথ্য জমেছে। এছাড়া সিঙ্ক্রোট্রন ব্যবহারের সুবিধা পৃথিবীতে খুবই সীমিত এবং সেখানে স্ক্যানের সময় পাওয়া কঠিন। তবু এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ‘অ্যান্টস্ক্যান’ ইতিমধ্যেই এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। গবেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই পদ্ধতি শুধু পিঁপড়ে নয়, অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রাণীর অ্যানাটমি বোঝার পথ খুলে দিতে পারে।

 

সূত্র: High-throughput phenomics of global ant biodiversity; Nature Methods ; March 26

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × 5 =