বিষণ্নতা ও আত্মহত্যামূলক চিন্তা আধুনিক সমাজের এক গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। এ এমনই এক মানসিক ব্যাধি, যা ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা, অনুভূতি নিজের জীবন সম্বন্ধেই মানুষকে বীতস্পৃহ করে তোলে। এ ধরনের পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার জন্য মনরোগবিশেষজ্ঞরা বাজারচলতি হতাশারোধক ওষুধ সেবনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই প্রচলিত অবসাদরোধক ওষুধগুলো কাজ করতে বেশ সময় নেয়, কখনও কখনও কয়েক সপ্তাহও লেগে যায়। এই দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যেই অনেক রোগী চরম ঝুঁকির মুখে পড়েন। এই প্রেক্ষাপটেই কেটামিন থেরাপি একটি ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে উঠে এসেছে। কেটামিন হলো একটি চেতনা নাশক ওষুধ, যা মূলত অস্ত্রোপচারের সময় ব্যথা ও অচেতনতা তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, খুব কম মাত্রায় ও নিয়ন্ত্রিত ধরণে ব্যবহার করলে এটি তীব্র বিষণ্নতা ও আত্মহননমূলক চিন্তা দ্রুত কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের নেতৃত্বে পরিচালিত এবং মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের অর্থায়নে একটি বিস্তৃত প্রণালীবদ্ধ পর্যালোচনায় হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, কেটামিন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিষণ্নতা ও আত্মহত্যামূলক চিন্তার তীব্রতা কমাতে সক্ষম। এই পর্যালোচনাটিতে মোট ৮৩টি গবেষণা প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। 33 টি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা, 29 টি পরিকল্পনাহীন ট্রায়াল এবং 21 টি পর্যবেক্ষণমূলক অধ্যয়ন এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গবেষণার সবচেয়ে শক্তপোক্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে তীব্র বিষণ্ণতা ও দ্বিপ্রান্তিক বিষণ্ণতা (একাধারে বিষণ্ণতা ও অতিরিক্ত উৎফুল্লতা) চিকিৎসায় কেটামিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে। মাত্র একটি ডোজ প্রয়োগের পরই এক থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে উপসর্গের উন্নতি দেখা যায়, এবং এই প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, বারবার চিকিৎসা দিলে এই সুফল আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে—যদিও এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তের জন্য আরও উন্নত মানের গবেষণা প্রয়োজন।
আত্মহত্যামূলক চিন্তার ক্ষেত্রেও কেটামিনের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, এক বা একাধিক ডোজ ব্যবহারের পর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আত্মহত্যার চিন্তা ফিকে হতে থাকে। গড়ে এই ইতিবাচক পরিবর্তন তিন দিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। গবেষকদের মতে, এই সময়টুকু অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ এই সুযোগ থাকতে থাকতেই রোগীকে মনোচিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়ক থেরাপির আওতায় আনা সহজ হয়।
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্কও করেছেন। এই গবেষণাগুলো হয়েছে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল পরিস্থিতিতে, যেখানে কেটামিনের সম্ভাব্য ঝুঁকি দক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বিষণ্নতা ছাড়া অন্যান্য মানসিক রোগ, যেমন- উদ্বেগজনিত ব্যাধি, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার ও অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে কেটামিনের সম্ভাবনা থাকলেও, সেসব ক্ষেত্রে প্রমাণ এখনো সীমিত।
সবশেষে গবেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন, কেটামিন কোনো যাদুকরী ওষুধ নয়। কেটামিন থেরাপির সঠিক ডোজ, প্রয়োগপদ্ধতি, চিকিৎসার সংখ্যা এবং মনোচিকিৎসার সঙ্গে এর সমন্বয়—এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও বৃহৎ ও সুপরিকল্পিত গবেষণা অত্যন্ত জরুরি। তবেই এই থেরাপিকে নিরাপদ ও কার্যকর মূলধারার চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
সূত্র: “Ketamine for the treatment of mental health and substance use disorders: a comprehensive systematic review” by Zach Walsh, Ozden Merve Mollaahmetoglu, et.al; 23rd December 2021, British Journal of Psychiatry Open.
DOI: 10.1192/bjo.2021.1061
