
রুশ মনোবিজ্ঞানী লেভ সেমিওনোভিচ ভাইগটস্কির (১৮৯৬-১৯৩৪) নাম আজ শিক্ষা ও মনস্তত্ত্বের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা। অথচ ১৯২০-৩০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে তাঁর কাজ শুরু হলেও ১৯৬০ এর দশক পর্যন্ত বাইরের বিশ্ব তাঁকে চিনতেই পারেনি। আজ তাঁর তত্ত্বগুলো শিক্ষাব্যবস্থা, কগনিটিভ সায়েন্স, এমনকি ডিজিটাল লার্নিং টুলসের ভিত্তি। কী ছিল এই প্রতিভাবিদের চিন্তায়? কেন আজও তাঁর ধারণাগুলো প্রাসঙ্গিক? আসুন, ভাইগটস্কির জগতে ঢুকেই দেখি—যেখানে ভাষা মনের নির্মাতা, শ্রেণীকক্ষ বুদ্ধির কারখানা, আর প্রতিটি শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা এক সম্মিলিত শিল্পকর্ম।
চিন্তার সামাজিক স্ফুলিঙ্গ
ভাইগটস্কির মৌলিক আবিষ্কার ছিল শেখার প্রক্রিয়াকে “সমাজ-নির্মাণের উপকরণ” হিসাবে দেখা। সুইস মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক জা পিয়াজে (১৮৯৬-১৯৮০) বলেছিলেন, শিশুর বিকাশ তার একার অনুসন্ধানের ফল। ভাইগটস্কি বললেন—জ্ঞান সমাজের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় গড়ে ওঠে। ধরুন, একটি শিশু জুতোর ফিতে বাঁধা শিখছে: প্রথমে বাবা-মা হাত ধরে শেখায়, পরে শিশু নিজে চেষ্টা করে, শেষে তা নিঃশব্দে আয়ত্ত হয়ে যায়। এই যাত্রায় ভাষাই হলো সিঁড়ি। ভাইগটস্কির মতে, শব্দ কেবল যোগাযোগের নয়, স্ব-নিয়ন্ত্রণেরও হাতিয়ার। এগুলোই আমাদের চিন্তা, পরিকল্পনা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলে।
এই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত তত্ত্ব— জোন অব প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট (ZPD)। একে মনে করুন “সম্ভাবনার জোন”: যা একজন শিক্ষার্থী একা করতে পারে না, কিন্তু সাহায্য পেলে পারে—সেটাই তার আগামী দিনের সক্ষমতার ইঙ্গিত। যেমন, গণিতের ধাঁধায় আটকে থাকা শিশু শিক্ষকের সংকেত পেলে সমাধান খুঁজে পায়। আজকের ক্লাসরুমে এই তত্ত্বের ছায়া দেখা যায় গ্রুপ ওয়ার্ক, অ্যাডাপ্টিভ লার্নিং অ্যাপ, বা ডায়নামিক অ্যাসেসমেন্টে—যেখানে শুধু “বর্তমান জ্ঞান” নয়, “ভবিষ্যৎ বৃদ্ধির” সম্ভাবনাও মাপা হয়।
কথার বিবর্তন: সামাজিক ভাষা থেকে কন্ঠ
ভাষা নিয়ে ভাইগটস্কির কৌতূহল শৈশবশিক্ষা গবেষনাতেই থেমে যায়নি। তিনি দেখালেন, কীভাবে ভাষা সামাজিক হাতিয়ার থেকে বিকশিত হয়ে রূপ নেয় অন্তরের দিকনির্দেশক কণ্ঠস্বরে। যেমন, “আত্মকেন্দ্রিক ভাষা”—যে বাচ্চারা খেলার সময় নিজেদের সাথে কথা বলে। পিয়াজে একে বলেছিলেন “বৌদ্ধিক অপরিপক্বতা”। কিন্তু ভাইগটস্কি এখানে দেখলেন অন্তর্বাক-এর সূচনা। যখন একটি শিশু বলে, “ব্লকটা এখানে… না, এখানে!”, তখন সে সামাজিক হয়ে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে না—বরং নিজেক নির্দেশ দিচ্ছে। সময়ের সাথে এই বাহ্যিক সংলাপ সংকুচিত হয়ে পরিণত হয় আমাদের মাথার ভেতরের সংক্ষিপ্ত, বিমূর্ত কন্ঠে —যাকে এক গবেষক বলেছেন “চিন্তার টুইটার”।
দৈনন্দিন বনাম বৈজ্ঞানিক ধারণার টানাপোড়েন
” রুশ কৃষকরা কেন মোটা কোট পরেন?”— প্রশ্ন করলে রুশ শিশু উত্তর দেবে, “ময়লা হয় বলে!” একজন অর্থনীতিবিদ বলবেন মুনাফা, বাজার-ব্যবস্থার কথা। ভাইগটস্কি এ দুটিকে বললেন দৈনন্দিন ধারণা (অভিজ্ঞতাভিত্তিক) ও বৈজ্ঞানিক ধারণা (বিদ্যালয়ে শেখা পদ্ধতিগত জ্ঞান)। তাঁর মতে, শিক্ষার শক্তি এ দুয়ের মেলবন্ধনে: কৃষিকাজের পাঠ রুশ শিশুর “মোটা কোটের” ধারণাকে সমৃদ্ধ করে বিমূর্ত ধারণা দিয়ে, আবার অর্থনীতিকে জুড়ে দেয় মাটির গন্ধ ও ফসলের বাস্তবতার সাথে।
কিন্তু পরবর্তী গবেষণা দেখিয়েছে, এই মেলবন্ধন সহজ নয়। প্রাপ্তবয়স্করাও অনেক সময় স্কুলের গাণিতিক নিয়ম ছেড়ে বাজারের ‘মেন্টাল শর্ট কাট’ ব্যবহার করেন। তবু ভাইগটস্কির মূল বক্তব্য অমলিন: শেখা একটি সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া। গুয়াতেমালায় বয়নশিল্প হোক বা পলিনেশিয়ায় মাছধরা—জ্ঞান সবার মাঝে ভাগ হয়ে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়।
ভাইগটস্কির উত্তরাধিকার: একটি “বুম” এর গল্প
মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মারা যান ভাইগটস্কি। রেখে যান অসমাপ্ত তত্ত্ব, সেন্সর করা লেখা, আর ভুল অনুবাদের জট। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাঁর তত্ত্বকে আজ মন্টেসরি পদ্ধতি থেকে এআই টিউটর পর্যন্ত সব কিছুতেই উদ্ধৃত করা হয়। সমালোচকরা বলেন, অনেক “ভাইগটস্কি-লাইট” ব্যাখ্যা তাঁর মার্কসীয় মূলভিত্তিকে ভুলে গেছে। তবু তাঁর দর্শন—শিক্ষাকে সমাজ ও ভাষার মাধ্যমে দেখার দর্শন—আজও যুগান্তকারী।
আজ, যখন শিক্ষকরা কোলাবরেটিভ ক্লাসরুম চান, অ্যাপগুলো ZPD-স্টাইলে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে— তখন ভাইগটস্কি নিশ্চয়ই আড়াল থেকে হাসছেন। তাঁর শেষ বার্তা? আমরা একা নই, আমরা সমাজের কথোপকথন থেকে শিখি।
মনোবিজ্ঞানে আসার আগে ভাইগটস্কি লিখেছিলেন হ্যামলেট- এর ওপর থিসিস। সেখানেই আভাস মিলেছিল তাঁর আজীবনের থিমের: অন্তর্দ্বন্দ্ব কীভাবে বাইরের বিশ্বকে গড়ে, আর নিজেও গড়ে ওঠে। ডেনমার্কের যুবরাজ নিশ্চয় সম্মত হতেন!
সংক্ষেপে, ভাইগটস্কি দেখিয়েছিলেন, মননের বিকাশ ঘটে সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায়—ভাষা, সহযোগিতা, আর “আমি পারব না” ও “আমরা পারি” এর মধ্যেকার ফাঁক জুড়ে। তাঁর তত্ত্ব আমাদের মনে করায়: প্রতিটি শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা সমাজের হাতেই ফোটে, সবসময় অগ্রসর হয় “পরবর্তী সম্ভাবনার জোন” এ।