আলঝাইমার রোগের চিকিৎসায় নতুন আশার খবর দিলেন বিজ্ঞানীরা। এতদিন ধরে যেসব ওষুধ ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলো মূলত মস্তিষ্কে জমে থাকা ক্ষতিকর প্রোটিনের স্তূপ, অ্যামাইলয়েড প্লাক সরানোর দিকেই জোর দেয়। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, শুধু প্লাক সরালেই হবে না, তার সাথে সাথে মস্তিষ্ককে আরও শক্তিশালী করে তুলতে হবে। আর সেই কাজেই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে “আইডল” (IDOL) নামে একটি উৎসেচক। আলঝাইমার রোগে, মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে অ্যামাইলয়েড প্লাক জমতে থাকে। এই প্লাক স্নায়ুকোষের স্বাভাবিক যোগাযোগে বাধা দেয় এবং স্মৃতিভ্রংশ ছাড়াও নানা জটিলতা তৈরি করে। সাম্প্রতিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন দুটি ওষুধ অনুমোদন করেছে- লেকানেম্যাব এবং ডোনানেম্যাব। এই ওষুধগুলো মস্তিষ্কের প্লাক কমাতে সাহায্য করে এবং অনেক ক্ষেত্রে রোগের অগ্রগতি কিছুটা থামিয়ে রাখতে পারে। তবে এগুলো মূলত জমে থাকা প্লাক পরিষ্কার করার কাজই করে। নতুন গবেষণাটি করেছে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের একটি গবেষক দল। তাঁদের মতে, “আইডল” নামে একটি নির্দিষ্ট উৎসেচককে যদি স্নায়ুকোষের ভেতর থেকে সরিয়ে দেওয়া যায় বা নিষ্ক্রিয় করা যায়, তাহলে শুধু প্লাকই কমবে না, মস্তিষ্কের ভেতরের যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত হবে। গবেষণায় বিজ্ঞানীরা প্রাণীর উপর পরীক্ষা চালান। তাঁরা মস্তিষ্কের দুটি আলাদা কোষে নিউরন (স্নায়ুকোষ) এবং মাইক্রোগ্লিয়া (মস্তিষ্কের প্রতিরক্ষা কোষ) “আইডল” জিন সরিয়ে দেখেন কী হয়। প্রথমে তাঁদের ধারণা ছিল, মাইক্রোগ্লিয়াতে পরিবর্তন আনলেই বেশি ফল মিলবে, কারণ এই কোষই মস্তিষ্কের ‘সাফাইকর্মী’ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ফলাফল ছিল ভিন্ন। দেখা যায়, নিউরন থেকে “আইডল” সরালে অ্যামাইলয়েড প্লাক উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। শুধু তাই নয়, এতে কমে যায় এ পি ও ই নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনের মাত্রাও। এ পি ও ই –এর একটি বিশেষ রূপ, APOE4, আলঝাইমার রোগের সবচেয়ে শক্তিশালী জেনেটিক ঝুঁকির উৎস হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ “আইডল”–কে নিশানা করলে একসঙ্গে প্লাক এবং জিনগত ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত প্রোটিন—দুটোকেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, “আইডল” সরালে এমন কিছু গ্রাহীকোষের মাত্রা বেড়ে যায়, যেগুলো মস্তিষ্কে চর্বি বা লিপিডের স্বাভাবিক বিপাক এবং স্নায়ুকোষের সুস্থ যোগাযোগ বজায় রাখতে সাহায্য করে। গবেষকেরা বলছেন, মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে সুস্থ যোগাযোগ বজায় থাকলে, রোগ থাকলেও মানসিক সক্ষমতা কিছুটা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হতে পারে। বাস্তব সমস্যা হলো, অধিকাংশ রোগীর আলঝাইমার তখনই ধরা পড়ে, যখন তাঁদের মস্তিষ্কে ইতিমধ্যে অনেক প্লাক জমে গেছে। তাই শুধু প্লাক সরানোই যথেষ্ট নাও হতে পারে। নতুন এই কৌশল মস্তিষ্ককে রোগের ক্ষতির বিরুদ্ধে আরও সহনশীল করে তুলতে পারে, যা চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। গবেষকেরা এখন এমন ওষুধ তৈরির দিকে এগোচ্ছেন, যা “আইডল”উৎসেচকের কার্যকারিতা তখনই বন্ধ করতে পারবে। যেহেতু উৎসেচকের একটি নির্দিষ্ট সক্রিয় অংশ থাকে, যেখানে ওষুধ সহজে যুক্ত হতে পারে, তাই নিশানাভিত্তিক ওষুধ তৈরির সম্ভাবনাও বেশি। এতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। পরবর্তী ধাপে এই সম্ভাব্য ওষুধগুলোর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা প্রাণী মডেলে পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি দেখা হবে, “আইডল” বন্ধ করলে স্নায়ুকোষের সংযোগ দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে কি না এবং আলঝাইমারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, টাউ প্রোটিনের ক্ষতি কমানো যায় কি না। সব মিলিয়ে, এই গবেষণা আলঝাইমার চিকিৎসায় নতুন দিক দেখাচ্ছে। শুধু মস্তিষ্কের ‘আবর্জনা’ সরানো নয়, বরং মস্তিষ্ককে আরও শক্তিশালী করে তোলাই হতে পারে ভবিষ্যতের বড় কৌশল।
সূত্র: Neuroscience News; Feb 12, 2026
