ইউরেনাস- ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডলের রহস্য ভেদ  

ইউরেনাস- ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডলের রহস্য ভেদ  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ মার্চ, ২০২৬

সম্প্রতি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ আবারও সৌরজগতের নীলাভ শীতলতম গ্রহের এক রহস্যের পর্দা সরাল। অত্যাধুনিক অবলোহিত দৃষ্টিশক্তি ব্যবহার করে ওয়েব প্রথমবারের মতো ইউরেনাস-ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডলের একটি বিশদ ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করেছে। যেখানে উন্মোচিত হয়েছে মেরুজ্যোতির জ্বলজ্বলে প্রভা, হাজার হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় তাপমাত্রার অস্বাভাবিক শিখর, এবং গ্রহটির অদ্ভুতভাবে হেলে থাকা চৌম্বক ক্ষেত্রের গভীর প্রভাব। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি সহ আন্তর্জাতিক একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী।

গবেষকেরা ওয়েবের শক্তিশালী NIRSpec যন্ত্র ব্যবহার করে প্রায় ১৭ ঘণ্টা ধরে, অর্থাৎ ইউরেনাসের প্রায় এক পূর্ণ আবর্তনকাল, গ্রহটিকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে তারা আবহমণ্ডলের অনেক ওপরে ক্ষীণ আণবিক বিকিরণ শনাক্ত করেন, যা থেকে তাপমাত্রা ও আয়নঘনত্বের উচ্চতার সঙ্গে পরিবর্তন নির্ণয় করা সম্ভব হয়। মেঘস্তরের উপরে প্রায় ৫,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত যে অঞ্চলটি আয়নমণ্ডল নামে পরিচিত, সেখানেই বায়ুমণ্ডল আয়নিত হয়ে চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে তীব্র মিথস্ক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ে।

মানচিত্রে দেখা গেছে, মেঘের উপরে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ কিলোমিটার উচ্চতায় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ, গড়ে প্রায় ৪২৬ কেলভিন (প্রায় ১৫০ 0 সেলসিয়াস)। তবে এই তাপমাত্রা আগের দূরবীন বা পুরনো মহাকাশযানের প্রতিবেদনের তুলনায় কম। এ থেকে ইঙ্গিত মেলে যে ইউরেনাসের ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডল গত তিন দশক ধরে ক্রমাগত শীতল হচ্ছে। অন্যদিকে, আয়নঘনত্ব সর্বাধিক পাওয়া গেছে প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার উচ্চতায়। দ্রাঘিমাভেদে স্পষ্ট তারতম্যও ধরা পড়েছে, যা গ্রহটির জটিল ও অসম চৌম্বক ক্ষেত্রের গঠনের প্রতিফলন।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় আবিষ্কার হলো ইউরেনাসের চৌম্বক মেরুর কাছে দুটি উজ্জ্বল মেরুজ্যোতির আলোক বলয় (অরোরাল ব্যান্ড)। এই দুই বলয়ের মাঝামাঝি অঞ্চলে বিকিরণ ও আয়নঘনত্ব কমে যাওয়ায় একটি অন্ধকার অংশও শনাক্ত হয়েছে। সম্ভবত এটি চৌম্বক ক্ষেত্ররেখার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইউরেনাসের চৌম্বক ক্ষেত্র তার ঘূর্ণন অক্ষের তুলনায় হেলানো ও স্থানচ্যুত; ফলে মেরুপ্রভাগুলো স্থির নয়, বরং জটিল পথে পৃষ্ঠ জুড়ে ঘুরে বেড়ায় এবং বায়ুমণ্ডলের গভীর স্তর পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে।

শুধু ইউরেনাস নয়, দৈত্যাকার বরফাবৃত গ্রহগুলির শক্তি-বিনিময় ও বায়ুচক্র বোঝার ক্ষেত্রেও এ এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এমনকি আমাদের সৌরজগতের বাইরের বিশাল গ্রহগুলির বৈশিষ্ট্য নির্ণয়েও এটি ভবিষ্যতে সহায়ক হবে।

 

সূত্র: “JWST Discovers the Vertical Structure of Uranus’ Ionosphere” by Paola I. Tiranti, H. Melin, et.al; 19th February 2026, published in Geophysical Research Letters.

DOI: 10.1029/2025GL119304

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 + 12 =