ইন্ডোর ট্যানিং-এর অপপ্রভাব

ইন্ডোর ট্যানিং-এর অপপ্রভাব

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ জানুয়ারী, ২০২৬

আমরা ফর্সা রঙের পিছনে ছুটি, কিন্তু হালকা রোদে ছোঁয়া উজ্জ্বল বাদামি ত্বকের আকর্ষণ আজকাল পশ্চিমে অনেকের কাছেই সৌন্দর্যের চিহ্ন। অথচ এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর জৈবিক মূল্য। সাম্প্রতিক এক গবেষণা জানাচ্ছে, ইনডোর ট্যানিং নামক এমন একটি প্রক্রিয়া ইদানীং খুব প্রচলিত হয়েছে , যেখানে ঘরের ভেতরে কৃত্রিমভাবে উৎপন্ন অতিবেগুনি রশ্মি ব্যবহার করে ত্বককে সূর্যালোকে পোড়া বা বাদামি বর্ণের মতো করে তোলা হয়। সাধারণত এই উদ্দেশ্যে ট্যানিং বেড বা ট্যানিং ল্যাম্প ব্যবহার করা হয়, যা সূর্যের আলোর অনুকরণে অতিবেগুনি রশ্মির বিকিরণ ছড়ায়।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ইনডোর ট্যানিং ত্বকের কোষের ডিএনএ-র ক্ষতি করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে অকাল বার্ধক্য, জিনের মিউটেশন ও ত্বক ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। ফলে আধুনিক জনস্বাস্থ্য গবেষণায় ইনডোর ট্যানিংকে একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ সৌন্দর্যচর্চা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ফ্রান্সিসকো এবং নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে মর্যাদাপূর্ণ সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ত্রিশ ও চল্লিশের কোঠায় থেকেও নিয়মিত ট্যানিং বেড ব্যবহার করেন, তাদের ত্বকের কোষে এমন পরিমাণ জিনগত পরিব্যক্তি হয়েছে, যা সাধারণত সত্তর বা আশি বছরের মানুষের ত্বকে দেখা যায়। অর্থাৎ ক্যালেন্ডারের হিসাবে তারা তরুণ হলেও, জিনগত বাস্তবতায় তাদের ত্বক বহু বছর আগেই বুড়িয়ে গেছে।

গবেষণার সহ-প্রথম লেখক ড. বিশাল তান্ডুকার এই ফলাফলকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন ট্যানিং বেড ব্যবহারকারীদের ত্বকে তাঁরা এমন মাত্রার ডিএনএ ক্ষতি দেখেছেন, যা সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় কয়েক দশক বেশি বয়স্ক ত্বকের সঙ্গে মিলে যায়।

এই জিনগত ক্ষতিগুলো কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, এগুলো ভবিষ্যতের ত্বকের ক্যানসারের বীজ। আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ত্বকের ক্যানসার যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে সাধারণ ক্যানসারগুলোর একটি। এর মধ্যে মেলানোমা তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও এতে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। প্রতি বছর প্রায় ১১ হাজার মানুষ এই রোগে প্রাণ হারান, যার প্রধান কারণ অতিবেগুনি রশ্মি।

এই রশ্মি শুধু সূর্যের আলোতেই সীমাবদ্ধ নয়, ট্যানিং বেডের কৃত্রিম আলোও সমানভাবে বা কখনো কখনো আরও বেশি মাত্রায় ডিএনএর ক্ষতি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে ট্যানিং বেড ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে মেলানোমার ঝুঁকিও বাড়ছে।

গবেষকরা ৩২ হাজারের বেশি রোগীর মেডিক্যাল তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন এবং ২৬ জন দাতার ত্বক থেকে নেওয়া ১৮২টি কোষের জিনগত পরীক্ষা করেছেন। আশ্চর্যের বিষয়, কোমরের নীচের অংশে যেখানে সূর্যের আলো খুব কম পড়ে কিন্তু ট্যানিং বেডের আলো সরাসরি লাগে সেখানে ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট মিউটেশন সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।

গবেষণার প্রধান লেখক অধ্যাপক এ. হান্টার শেইন স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন, “একবার মিউটেশন হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। তাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হলো শুরুতেই কৃত্রিম অতিবেগুনি রশ্মি থেকে দূরে থাকা।” কৃত্রিম সৌন্দর্যের সাময়িক মোহে নেওয়া সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ত্বকের জন্য বহন করতে পারে আজীবনের জিনগত শাস্তির বোঝা।

 

সূত্র: “Molecular effects of indoor tanning” by Pedram Gerami, Bishal Tandukar, et.al; 12th December 2025, Science Advances.

DOI: 10.1126/sciadv.ady4878

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × three =