
একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে উচ্চ প্যারাগুয়ে নদীর অববাহিকর উভচর প্রাণীদের সমূহ বিপদ উপস্থিত। যেমন ব্যাঙ, কুমির, গেছোব্যাঙ।এই অঞ্চলে প্যান্টানাল জলাভূমি এবং আশেপাশের এলাকায় বিভিন্ন প্রাণীদের বাস। গবেষকদের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২১০০ সালের মধ্যে এই প্রাণীদের থাকার উপযুক্ত জায়গা প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে। ব্রাজিল ও সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা একসাথে কাজ করে প্রাণীদের আবাসস্থলের তথ্য ও জলবায়ুর পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে এই আশঙ্কাজনক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। গবেষকরা উভচর প্রাণীদের বসবাসের জায়গাগুলোর তথ্য জলবায়ু পরিবর্তনের দুটি সম্ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন।এরমধ্যে একটিতে কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পরিস্থিতি আছে
এবং অন্যটিতে বেশি আছে। গবেষণায় দেখা গেছে পরিস্থিতি খারাপ হলে উচ্চ প্যারাগুয়ে নদী অববাহিকার ৮০ শতাংশের বেশি উভচর প্রাণী তাদের বাসস্থান হারাতে পারে।গবেষক ম্যাথেউস ওলিভেইরা নেভেস বলেছেন, যদি জলবায়ুর পরিবর্তন একটু ভালোও হয়, তাহলেও প্রায় ৯৯.৮৭ শতাংশ এলাকায় উভচর প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আর অবস্থা খারাপ হলে এই হার ৯৯.৯৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাবে। এটা স্পষ্ট যে, প্যান্টানাল ও আশেপাশের এলাকায় ব্যাঙসহ অন্যান্য উভচর প্রাণীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি কমছে, এবং আরও দ্রুতগতিতে কমতে পারে। যে এলাকাগুলো সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত, সেগুলো মোট ভূখণ্ডের মাত্র ৫.৮৫ শতাংশ জুড়ে রয়েছে । তার মধ্যে উভচর প্রাণীদের জন্য প্রকৃত নিরাপদ জায়গা মাত্র ৫ শতাংশ। গবেষণার প্রধান, মারিও রিবেইরো মউরা বলেছেন, এই সংরক্ষিত এলাকাগুলো প্যান্টানালের উভচর প্রাণীদের রক্ষা করতে খুব একটা কার্যকর নয়। আগে তিনি ক্যাম্পিনাস স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন, বর্তমানে ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অফ পারাইবায় অধ্যাপক। জীবৈচিত্রের বিলুপ্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশও উদ্বিগ্ন। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর ৩০ শতাংশ জায়গা সুরক্ষিত করে তুলতে হবে। গবেষক মউরা জানান, বর্তমানে সংরক্ষিত এলাকা ও আদিবাসী ভূখণ্ড মিলিয়ে মাত্র ১৭ শতাংশ এলাকা নির্ধারিত রয়েছে। নতুন সুরক্ষিত এলাকা তৈরি করা দরকার এবং আগের সংরক্ষিত এলাকাগুলির পরিসর আরও বাড়ানো উচিত। তারা এমন সব জায়গার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন, যেগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের পরও উভচর প্রাণীদের বেঁচে থাকার জন্য উপযুক্ত থাকবে। ভবিষ্যতে জলবায়ু কেমন হবে তা জানার জন্য তাঁরা আইপিসিসি-র তথ্য ব্যবহার করেছেন। অনুকূল হিসাবে বলা হয়েছে, দূষণ এখনকার মতোই থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ২°সেলসিয়াস বাড়তে পারে। কিন্তু যদি দূষণ আরও বাড়তে থাকে, তাহলে শতকের শেষের দিকে তাপমাত্রা ৪°সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা অনেক বেশি বিপজ্জনক।
প্যারাগুয়ে নদীর আশপাশের এলাকায় (যার মধ্যে প্যারাগুয়ে ও বলিভিয়ার কিছু অংশ আছে), জলবায়ু পরিবর্তনের ভালো বা খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য বিস্তর। পরিস্থিতি খারাপ হলে প্রায় সব উভচর প্রাণীর বাসস্থান (৯৯.৮৭% বা ৯৯.৯৯%) ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। গবেষকরা ৪,০০০-রও বেশি নথির ওপর ভিত্তি করে এই এলাকায় বসবাসকারী ৭৪ ধরনের ব্যাঙ ও উভচর প্রাণীর তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এসব প্রাণী আর্দ্র পরিবেশ ও জলের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় এবং মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে তাদের বাসস্থান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও উভচর প্রাণীদের নিরাপদ আশ্রয় খুব কম পরিমানে থাকবে। গবেষণায় দেখা গেছে যে উভচর প্রাণীদের জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য আশ্রয়স্থলগুলি উত্তর মাতো গ্রোসোর কুইয়াবার কাছে, সেরাডো সাভানার প্রান্তে এবং দক্ষিণ-পূর্বে মাতো গ্রোসো দো সুল রাজ্যের ক্যাম্পো গ্র্যান্ডের কাছে অবস্থিত।
।প্যারাগুয়ে চাকো এলাকার কাছে দক্ষিণ-পশ্চিমের কিছু জায়গা উভচর প্রাণীদের জন্য সুরক্ষিত থাকতে পারে। কিন্তু এই জায়গাগুলো পুরো প্যারাগুয়ে নদী অববাহিকার খুবই ছোট অংশ। গবেষকরা দেখেছেন, বর্তমানে সংরক্ষিত অনেক এলাকায় উভচর প্রাণীদের সংখ্যা খুব কম। কিছু জায়গায় হয়তো নতুন কিছু প্রজাতি বাড়তে পারে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে উভচর প্রাণীদের সংখ্যা কমবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংক্ষেপে, এখন যে সংরক্ষিত এলাকা আছে, তার মাত্র ১৩.৭ শতাংশ জায়গায় ভবিষ্যতে প্রাণীদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি। এর বেশিরভাগই আদিবাসীদের বসবাসের এলাকা, গবেষক মৌরা ও অন্যান্য বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রকৃতির সুরক্ষার জন্য নতুন সংরক্ষিত এলাকা তৈরি করতে হবে, আগের সংরক্ষিত জায়গাগুলো পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং জমির ব্যবহার এমনভাবে বদলাতে হবে যাতে নদী, হ্রদ ও সমুদ্রের ক্ষতি কম হয়। প্যারিস চুক্তিতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১.৫° সেলসিয়াস এর বেশি যেন না বাড়ে, কিন্তু ২০২৪ সালেই আমরা সেই মাত্রায় পৌঁছে গেছি।তাঁর মতে, পৃথিবীর অর্থনীতি এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। এত দ্রুত বড় পরিবর্তন না আনা গেলে প্রকৃতি ও মানব সমাজ ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়বে। বর্তমানে উচ্চ পারাগুয়ে নদী এলাকার উভচর প্রাণীদের অবস্থা আরও সংকটজনক। এরা বেঁচে থাকার জন্য আর্দ্র ও স্থিতিশীল পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। গবেষণায় দেখা গেছে, কার্বন গ্যাসের দূষণ এভাবেই চলতে থাকলে তাদের বাসস্থান প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। এর ফলে তাদের সংখ্যা ভয়ানকভাবে কমে যেতে পারে এবং অনেক প্রজাতি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।তবে প্রকৃতির সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে দ্রুত কাজ করা হলে এসব প্রাণী শুধু বেঁচে থাকতেই নয়, বরং অনেক দিন ধরে ভালোভাবে টিকে থাকতে পারবে।
এই গবেষণাটি জার্নাল অফ অ্যাপ্লাইড ইকোলজি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।