ওভির‍্যাপ্টারের ডিম ফোটানোর অনন্য কৌশল 

ওভির‍্যাপ্টারের ডিম ফোটানোর অনন্য কৌশল 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১ এপ্রিল, ২০২৬

ডাইনোসরের ডিমের সংরক্ষণ সাধারণত খুবই বিরল। কিন্তু ছোট আকারের পাখির মতো দেখতে ডাইনোসর ওভির‍্যাপ্টারদের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা এক অসাধারণ ব্যতিক্রম দেখতে পান। প্রায় ৭ কোটি বছর আগে, অর্থাৎ ক্রিটেশিয়াস পরবর্তী যুগের এই প্রাণীরা বিপুল সংখ্যক ডিম ও তাদের বাসস্থানের জীবাশ্ম রেখে গেছে। এসব জীবাশ্ম থেকে জীবাশ্মবিদদের হাতে উঠে এসেছে অমূল্য তথ্যভাণ্ডার। ডিম পাড়ার ধরন থেকে শুরু করে এমনকি ডিমের নীল-সবুজ আভা সম্পর্কেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাঁরা জানতে পেরেছেন। তবে একটা কৌতূহল এতদিন অপূর্ণ ছিল, যে কীভাবে তারা তাদের ডিমে তা দিত?

এই রহস্য উন্মোচনের জন্য সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এক অভিনব পরীক্ষা পদ্ধতির আশ্রয় নেন। এই গবেষণা পত্রটি ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশান জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা একটি কৃত্রিম বা সিমুলেটেড ওভির‍্যাপ্টারের বাসা বানান, যাতে এই ডাইনোসররা কীভাবে তাদের ডিমে তাপ দিত তা পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব। সাধারণত, ডাইনোসরের আচরণ বোঝার জন্য পাখি ও কুমির—তাদের এই দুই নিকটতম জীবিত আত্মীয়র আচরণ বিশ্লেষণ করা হয়। কিন্তু এখানে সমস্যা হল: কুমিররা ডিম মাটির নীচে পুঁতে রাখে, আর পাখিরা খোলা বাসায় ডিম পেড়ে নিজের শরীরের তাপে ডিমকে উষ্ণ রাখে। দুটি একেবারে ভিন্ন পদ্ধতি। তাহলে প্রশ্ন,ওভির‍্যাপ্টার কোন পথ অনুসরণ করত?

কৌতূহল নিরসনের জন্য গবেষকরা কাঠ, ফোম, কাপড় ও কৃত্রিম তাপের উৎস দিয়ে তৈরি করেন ডাইনোসরের কৃত্রিম মডেল। বিশেষত হিউনিয়া হুয়াঙ্গি ও নেমেগটোমিয়া বারসবোল্ডি প্রজাতির আদলে। একইসঙ্গে, রেজিন দিয়ে তৈরি ফাঁপা ডিমে জল ভরে ডিমের অভ্যন্তরীণ গঠন অনুকরণ করা হয় এবং তাপমাত্রা মাপার জন্য বসানো হয় সেন্সর। ডিমগুলোকে জীবাশ্মের আদলে জোড়ায় জোড়ায় সাজানো হয়, একটির ওপর আরেকটি রেখে, যাতে জীবাশ্মে পাওয়া ভেতরের ও বাইরের বৃত্তের মতো একই গঠন তৈরি হয়।

দেখা গেল, ডাইনোসরের এই কৃত্রিম ডাইনোসর মডেল একসঙ্গে সব ডিমের সঙ্গে সমান তাপ সংযোগ বজায় রাখতে পারে না। ঠান্ডা পরিবেশে ভেতরের ও বাইরের ডিমের তাপমাত্রার পার্থক্য প্রায় ১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছায়, যা অকালে ডিম ফোটার ঝুঁকি তৈরি করে। তবে উষ্ণ পরিবেশে এই ব্যবধান প্রায় ঘুচে যায়।

এই পর্যবেক্ষণ থেকে এবার গবেষকরা একটি নতুন ধারণা তুলে ধরেন। তাদের মতে ওভির‍্যাপ্টার্স হয়তো আধুনিক পাখির মতো সারাক্ষণ ডিমে তা দিত না। সূর্যের সঙ্গে একপ্রকার যৌথ মাতৃত্ব হিসেবে তারা সূর্যের তাপকে কাজে লাগাত। অর্থাৎ, সূর্যই ছিল তা দেওয়ার জন্য দরকারি উষ্ণতার প্রধান উৎস। এই কৌশল বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল একমাত্র ক্রিটেশিয়াস পরবর্তী যুগের উষ্ণ জলবায়ুর কারণে। আজকের পৃথিবীতে কেন এই পদ্ধতি আর দেখা যায় না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে জলবায়ুর পরিবর্তনে। সময়ের সঙ্গে পৃথিবী ঠান্ডা হয়েছে, আর সেই সঙ্গে বদলে গেছে পিতামাতার দায়িত্ব পালনের কৌশলও। আধুনিক পাখিদের তাই ডিম ফোটাতে নিজেদের শরীরের তাপের ওপরেই নির্ভর করতে হয়।

এই গবেষণা শুধু ডাইনোসরের আচরণ নয়, বরং আমাদের গ্রহের পরিবর্তিত জলবায়ুগত পরিবেশ কীভাবে জীবনের কৌশলকে রূপান্তরিত করেছে তারই এক উল্লেখ্য সাক্ষী।

সূত্রঃ: Nautilus Magazine,24th March 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + 8 =