
বর্তমানে জন-চিকিৎসার সবচেয়ে বড় বিপদ হল অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী রোগজীবাণু। আশার কথা, বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ নতুন ধরণের একটি অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেছেন, যা তিনটি শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে একটির ক্ষেত্রে ঘাতক হিসাবে কাজ করতে পারছে।এটি মানবকোষের জন্য ক্ষতিকর নয়। সদ্য আবিষ্কৃত এই অ্যান্টিবায়োটিক যৌগটি একটি প্রয়োগশালার এক কর্মীর বাগানের মাটির নমুনা থেকে পাওয়া গেছে। বোস্টন, ম্যাসাচুসেটসের নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাণুবিদ কিম লুইস বলেছেন, “প্রকাশ্য জায়গায় অত্যন্ত আকর্ষণীয় কতকিছু যে লুকিয়ে আছে, তা অনেকসময়ই আমরা বুঝতে পারি না”। সাম্প্রতিক আবিষ্কারটি ‘ব্যাকটেরিয়ার প্রোটিন তৈরির কারখানা’ নামে অভিহিত রাইবোসোমকে এমনভাবে নিশানা ও প্রতিহত করতে পারে যা এখনকার অন্যান্য অ্যান্টিবায়োটিক পারে না। লুইস বলেন, “নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের খোঁজ খুব জরুরি। কারণ, বারংবার ভুলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে, ব্যাকটেরিয়াগুলি পুরনো অ্যান্টিবায়োটিকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বিশেষ করে গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া, যা লিপো-পলিস্যাকারাইড (LPS) নামক একটি পদার্থ দ্বারা সুরক্ষিত। বিগত ৫০ বছর ধরে গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার জন্য নতুন কোনো অ্যান্টিবায়োটিক অনুমোদিত হয়নি। ২০২১ সালে, প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বিশ্বব্যাপী ১.১ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। ২০৫০ সালে এই সংখ্যা ১.৯ হয়তো মিলিয়নে পৌঁছাতে পারে। ক্যানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক গেরি রাইট বলেছেন, “অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ জনিত সংকট চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি বড় হুমকি”। রাইট এবং তাঁর সহকর্মীরা এমন এক জীবাণু খুঁজছিলেন, যারা নতুন কৌশলে এই সুপারবাগ বা শক্তিশালী ব্যাক্টেরিয়াগুলিকে প্রতিহত করতে পারবে। তারা ছত্রাক এবং ছোট শ্যাওলার কোষবৃদ্ধির মাধ্যমে জীবাণুদের বংশ বৃদ্ধি ঘটানোর একটি পেট্রি ডিশে মাটির নমুনা সংগ্রহ করে এক বছর ধরে রেখে দেন। পরে গবেষকরা এই নমুনাগুলোকে, সাধারণ কিন্তু বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া ই কোলাই-এর ওপর পরীক্ষা করেন। তার মধ্যে একটি নমুনা শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া-বিরোধী কার্যকারিতা দেখিয়েছে। এটি হল পাইনিব্যাসিলাস বংশের একটি প্রজাতি। আরও পরীক্ষা, জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং কাঠামোগত বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে যে এই ব্যাকটেরিয়াটি এমন একটি যৌগ তৈরি করে যা পেপটাইডের একটি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এই যৌগটি লাসো আকারের গাঁটের মতো গঠন তৈরি করে। এই পেপটাইডগুলি শক্তিশালী এবং সম্ভবত হজম হওয়ার পরেও টিকে থাকতে পারে। “এটির গঠন সুন্দর, সত্যিই সুসংহত এবং অবিশ্বাস্যভাবে মজবুত,” রাইট বলেন।গবেষকরা যৌগটির নাম দিয়েছেন লারিওসিডিন। কিভাবে কাজ করছে যৌগটি? এটি রাইবোসোম ও ট্রান্সফার আর এন এ এর সঙ্গে যুক্ত হয় – যা রাইবোসোমকে পেপটাইড গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড সরবরাহ করে। এটি রোগজীবাণুর জেনেটিক কোডকে সঠিকভাবে পড়তে বাধা দেয়, ফলত কোডটি বিকৃত হয় এবং রাইবোসোমটি ভুল পেপটাইড তৈরি করে। সেগুলি কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়ার জন্য বিষাক্ত হতে পারে। লুইস বলেন, লারিওসিডিনের কাজের ভিন্ন পদ্ধতির কারণে রোগজীবাণুরা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। দেখা গেছে, লারিওসিডিন বেশ কিছু সাধারণ কিন্তু বহু ওষুধ-প্রতিরোধী রোগজীবাণুর বংশবৃদ্ধির গতি ধীর করে দিয়েছে। গবেষকরা মানবকোষসমূহের বিরুদ্ধে এর কোনও টক্সিসিটি বা অধিবিষক্রিয়ার প্রমাণ পাননি। তাঁরা লারিওসিডিন ব্যবহার করে কার্বাপেনেম প্রতিরোধী অ্যাসিনেটোব্যাকটার বাউমানি C0286 দ্বারা সংক্রমিত ইঁদুরদের চিকিৎসা করেছেন – যা ‘অন্তিম আশ্রয়ের অ্যান্টিবায়োটিক’ বলে সুবিদিত। দেখা গেল, বিনা অ্যান্টিবায়োটিকে চিকিৎসিত ইঁদুরগুলি সংক্রমণের ২৮ ঘণ্টার বেশি বাঁচতে পারেনি। বিপরীতে, চিকিৎসিত ইঁদুরগুলি ৪৮ ঘণ্টা পরও বেঁচে ছিল। এমনকি তাদের রক্তে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণও কমে গিয়েছিল। লুইস বলেন, “যৌগটি খুব বড়, তাই ওষুধ কোম্পানিগুলি সম্ভবত এর ছোট সংস্করণ তৈরি করার উপায় খুঁজবে, যাতে লক্ষ্যহীন প্রভাবের ঝুঁকি কম থাকে”। রাইট ও তাঁর সহকর্মীরা এখন মানুষের ওপর প্রয়োগ করার আগে যৌগটিকে ‘ওষুধ’ হিসেবে ব্যবহার করতে, আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন।