কোকো, বেরি বা রেড ওয়াইন খেলে যে শুষ্ক, কষা বা মুখ টানটান হয়ে যাওয়ার অনুভূতিটা হয়, সেটা কি কেবলই স্বাদের ব্যাপার? সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই তেতো-কষা স্বাদই হতে পারে মস্তিষ্ককে জাগিয়ে তোলার এক গোপন সুইচ। জাপানের শিবাউরা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির বিজ্ঞানীদের নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, উদ্ভিজ্জ যৌগ ফ্ল্যাভানল-এর এই তেতো–কষা অনুভূতিটা নিছক স্বাদের ব্যাপার নয়। এই স্বাদ সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে। এটা মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের সংবেদী ধাক্কা। এ ধাক্কা স্নায়ুতন্ত্রকে হালকা ঠেলা দিয়ে মস্তিষ্ককে জাগিয়ে রাখে। অনেকটা হালকা ব্যায়ামের মতো প্রভাব ফেলে মস্তিষ্কে।
ফ্ল্যাভানল হলো এক ধরনের উদ্ভিজ্জ পলিফেনল যৌগ, যা দীর্ঘদিন ধরেই হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানো, স্মৃতিশক্তি বাড়ানো এবং মস্তিষ্ককোষ রক্ষায় সুফল দিয়ে আসছে। কিন্তু একটি ন্যায্য প্রশ্ন এতদিন বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে, যে ফ্ল্যাভানল শরীরে খুব অল্প পরিমাণে শোষিত হয়, তাহলে এত কম শোষণ সত্ত্বেও এটি কীভাবে মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গবেষক দলটি দৃষ্টি ফেরান স্বাদ ও সংবেদন স্নায়ুর দিকে। তাঁদের ধারণা ছিল, ফ্ল্যাভানলের কষা স্বাদ নিজেই একটি সংকেত হিসেবে কাজ করে, যা মুখের সংবেদী স্নায়ুর মাধ্যমে সরাসরি মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়।
এই ধারণার সত্যতা যাচাই করতে ১০ সপ্তাহ বয়সী ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। কিছু ইঁদুরকে নির্দিষ্ট মাত্রায় ফ্ল্যাভানল খাওয়ানো হয়। পরীক্ষায় এই ধারণার বাস্তব রূপ প্রকাশ পায়। ফ্ল্যাভানল খাওয়ানো ইঁদুরগুলো শুধু বেশি নড়াচড়াই করেনি, তারা পরিবেশ অন্বেষণে ছিল বেশি আগ্রহী, শেখার কাজে দ্রুত, আর স্মৃতির পরীক্ষায় স্পষ্টভাবে এগিয়ে। যেন মস্তিষ্কের ভেতরে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠেছে। তাদের
মস্তিষ্কের রাসায়নিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফ্ল্যাভানল গ্রহণের পর ডোপামিন, নরএপিনেফ্রিন এবং এদের সংশ্লিষ্ট রাসায়নিকের মাত্রা বেড়েছে। এগুলো মনোযোগ, উদ্দীপনা, সতর্কতা ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে মস্তিষ্কর লোকাস কেরুলিয়াস নামক অঞ্চলে সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমাদের জাগ্রত থাকা ও তথ্য মনে রাখার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এছাড়াও, মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের পিভিএন অঞ্চল, যা স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানেও সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রস্রাবে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়ার ঘটনাও এই সক্রিয়তার প্রমাণ ।
সব মিলিয়ে গবেষকরা বলছেন, এই প্রতিক্রিয়াগুলো অনেকটাই শারীরিক ব্যায়ামের সময় যে স্নায়বিক ও হরমোনগত পরিবর্তন ঘটে, তার মতো। অর্থাৎ, ফ্ল্যাভানল শরীরের জন্য এক ধরনের মৃদু স্ট্রেসর হিসেবে কাজ করে। একটা হালকা মানসিক চাপ তৈরি হয় ঠিকই , কিন্তু এই চাপই মস্তিষ্ককে আরও তীক্ষ্ণ ও সজাগ করে তোলে। এই চাপ মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা , মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর জন্য ভালো।
এই গবেষণা “সেন্সরি নিউট্রিশন” নামক নতুন ধারণার জন্ম দিল। যেখানে খাবারের পুষ্টিগুণের পাশাপাশি তার স্বাদ ও সংবেদনশীল প্রভাবকেও স্বাস্থ্যগঠনের অংশ হিসেবে বিবেচ্য। অর্থাৎ, ভবিষ্যতের খাবার শুধু পেট ভরাবে না, স্বাদের মাধ্যমেই মস্তিষ্ককেও ব্যায়াম করিয়ে সচল রাখবে।
সূত্র : That dry, bitter taste may be waking up your brain by Yasuyuki Fujii, Shu Taira,et.al; Materials provided by Shibaura Institute of Technology, This work was supported by JSPS KAKENHI (Grant Number 23H02166), Current Research in Food Science, 2025; 11: 101195 DOI: 10.1016/j.crfs.2025.101195
