
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ইস্ট কোস্টে অবস্থিত চেসাপিক উপসাগর একসময় ভরপুর ছিল নীল কাঁকড়ায় । স্থানীয় মানুষের খাবার, ব্যবসা আর কৃষ্টির এক বড় অংশ এই নীলচে রঙের সুস্বাদু কাঁকড়ার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপে চমকে দেওয়া তথ্য মিলেছে: কাঁকড়ার সংখ্যা বিপুল হারে কমে গেছে। এই খবর মৎস্যজীবী থেকে বিজ্ঞানী সবাইকে আতঙ্কিত করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে রক্ষা করা যাবে এই প্রিয় প্রাণীটিকে? গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন এক বিস্ময়কর সম্ভাবনা। একটি পরজীবী কৃমি নাকি এই মূল্যবান কাঁকড়ার প্রজনন ইতিহাস উদ্ঘাটন করে দিতে পারে।
এই কৃমির নাম Carcinonemertes carcinophila। শুনতে ভয়ঙ্কর মনে হলেও, এরা কাঁকড়ার শত্রু নয়, বরং এক অদ্ভুত গোপন বার্তাবাহক। স্ত্রী কাঁকড়া যখন ডিম পাড়ে, তখন এই ক্ষুদ্র কৃমিগুলো ডিমের গুচ্ছের ভেতরে ঢুকে সেখানেই থেকে যায়। কিছু ডিম তারা খেয়ে ফেলে, তবে তা এত কম যে কাঁকড়ার বংশবৃদ্ধিতে কোনো বড় ক্ষতি হয় না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, কৃমিরা খাওয়ার পর শরীরের রঙ বদলায় এবং আকারে বেড়ে ওঠে। আর এই পরিবর্তন থেকেই বোঝা যায় কাঁকড়াটি জীবনে কতবার ডিম পেড়েছে। এ যেন কাঁকড়ার শরীরে লুকানো এক জীবন্ত “ডায়েরি”!
এই গবেষণার মূল প্রশ্ন ছিল, বিভিন্ন লবণাক্ত পরিবেশে এই কৃমির টিকে থাকার ক্ষমতা কতটা। সাধারণত এই প্রজাতি ২০ psu এর নীচের লবণাক্ততায় বাঁচতে পারে না। কিন্তু এই গবেষণায় দেখা গেছে এরা আসলে অনেক বেশি সহনশীল : ১০ psu তেও টিকে থাকতে পারে, এমনকি ৫ psu এর মতো নিম্ন লবণাক্ততায়ও প্রায় ৩৯ ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে সক্ষম। এর মানে, নীল কাঁকড়ারা যখন নিম্ন-লবণাক্ত নদী থেকে উচ্চ-লবণাক্ত উপসাগরে ডিম পাড়তে যায়, তখনও এই কৃমিগুলো টিকে থেকে স্ত্রী কাঁকড়ার জীবনের বিভিন্ন ধাপে জৈব নির্দেশক হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রথমবার ডিম দেওয়া (প্রাইমিপ্যারাস) স্ত্রী কাঁকড়ারা সবচেয়ে বেশি সন্তান উৎপাদন করে, আর পরবর্তী পর্যায়ে (মাল্টিপ্যারাস) ধীরে ধীরে সেই সক্ষমতা কমে যায়। জুন মাসে ডিম পাড়া বেশির ভাগ স্ত্রী কাঁকড়াই প্রাইমিপ্যারাস, আর মরশুমের শেষে ডিম পাড়তে আসা কাঁকড়াগুলো মাল্টিপ্যারাস । অর্থাৎ, এই ধরনের স্ত্রী কাঁকড়ারা ইতিমধ্যে বহুবার ডিম পেড়ে ফেলেছে। ফলে প্রাইমিপ্যারাস স্ত্রী কাঁকড়াদের সংরক্ষণ করা গেলে উপসাগরে নীল কাঁকড়ার সংখ্যা বাড়ানোর সম্ভাবনা বেশি।
এই কৃমিগুলো যেন এক ধরনের “জীবন্ত ইতিহাস”। তা জানাতে পারে কোন কাঁকড়া ইতিমধ্যেই প্রজনন করেছে এবং কোনটি সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীল। ফলে মৎস্য ব্যবস্থাপনায় এগুলো ব্যবহার করে কোন কাঁকড়াকে রক্ষা করতে হবে এবং কোন পর্যায়ে সংগ্রহ করা উচিত তা আরও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব।
ভার্জিনিয়া ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্স এখন এই কৃমিকে জৈব নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করে নীল কাঁকড়ার সংখ্যা কিভাবে বাড়ানো যায় তার উপর গবেষণা চালাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও গবেষণা হলে প্রজনন-পর্বভিত্তিক সংরক্ষণ কৌশল গড়ে তোলা যাবে। তা চেসাপিক উপসাগরের নীল কাঁকড়ার মতো মৎস্যসম্পদ টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হবে। একসময় যাদের কেবল বিরক্তিকর পরজীবী মনে হতো, সেই কৃমিরাই হয়তো হয়ে উঠবে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার অপ্রত্যাশিত চাবিকাঠি।
সূত্র: “Salinity tolerance, hyposaline stress recovery, and survival of the nemertean worm, Carcinonemertes carcinophila (Nemertea) in relation to its host, the Atlantic blue crab, Callinectes sapidus” by Alexandria K. Pomroy, Alexandra K. Schneider and Jeffrey D. Shields, (9.7.2025), PLOS ONE.
DOI: 10.1371/journal.pone.0326493