কাজ শুরু করার অনীহা কেন? 

কাজ শুরু করার অনীহা কেন? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৯ জানুয়ারী, ২০২৬

সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যাটা প্রায়ই হয় কাজটা ‘শুরু করা’ নিয়ে। লম্বা রিপোর্টের প্রথম শব্দটা লেখা, উপচে পড়া সিঙ্ক থেকে নোংরা বাসনটা তুলতে হাত বাড়ানো, কিংবা দড়ি থেকে বহুদিন ধরে ঝোলা জামাকাপড় সরানো, এই প্রথম ধাপগুলোই যেন মস্তিষ্কের কাছে পাহাড় সম। ইচ্ছে নেই এমন নয়, কিন্তু মস্তিষ্ক যেন ব্রেক কষে বসে থাকে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেই মানসিক অন্তরায়ের স্নায়ুবৈজ্ঞানিক উৎস তারা হয়তো খুঁজে পেয়েছেন। এক নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মস্তিষ্কে একটি নির্দিষ্ট স্নায়ু-বর্তনী (নিউরাল সার্কিট) রয়েছে যা কাজ শুরু করার আগেই অনুপ্রেরণাকে চাপা দেয়। এক ধরনের অনুপ্রেরণা বাঁধ (“মোটিভেশন ব্রেক”) বলে। এই বর্তনী সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় হলে আবার লক্ষ্যভিত্তিক আচরণে ফিরে আসা যায়। এই অনুপ্রেরণা বাঁধ বিশেষভাবে যন্ত্রণা দেয় এমন মানুষদের, যাঁরা স্কিৎজোফ্রেনিয়া বা গুরুতর ডিপ্রেশনের সমস্যায় সমস্যায় ভোগেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই অনুপ্রেরণাহীনতা আর উদ্বেগজনিত ঝুঁকি বা ভীতি এক নয়। কাজটা বিপজ্জনক বলে পিছিয়ে যাওয়া আর কাজটা শুরু করতেই না পারা, এই দুইয়ের স্নায়ু ভিত্তি আলাদা। ভার্জিনিয়া টেক-এর কম্পিউটেশনাল সাইকিয়াট্রিস্ট পার্ল চিউ, যিনি নিজে এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না, তিনি বলেন, “এই পার্থক্যটা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। অনুপ্রেরণা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হওয়াটাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।“এর আগে মনে করা হত, কাজ শুরু করার সঙ্গে মস্তিষ্কের দুটি অংশ যুক্ত—ভেন্ট্রাল স্ট্রায়াটাম ও ভেন্ট্রাল প্যালিডাম। এই অঞ্চলগুলি পুরস্কার লাভ ও অনুপ্রেরণা প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু আগের গবেষণায় সমস্যাটা ছিল পদ্ধতিগত। বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা ব্যবহার করলে শুধু মনোগ্রাহীর অংশ নয় তার সাথে আশপাশের বর্তনীগুলিও সক্রিয় হয়ে পড়ে। ফলে অনুপ্রেরণার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগও বেড়ে যায়। গবেষক দল এক্ষেত্রে অনেক বেশি সূক্ষ্ম কৌশল ব্যবহার করেছেন। তারা দুটি পুরুষ ম্যাকাক বানরকে দুটি সিদ্ধান্তমূলক কাজে প্রশিক্ষণ দেন। একটিতে কাজ শেষ করলে মিলত জল এবং আরেকটিতে সরাসরি পুরস্কার। অন্যটিতে জল পাওয়ার পাশাপাশি মুখে আসত বিরক্তিকর বাতাসের ঝাপটা। প্রতিটি ট্রায়ালে বানরদের প্রথমে স্ক্রিনের মাঝখানে একটি বিন্দুর দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। এই কাজটা শুরু না করলে পুরস্কার বা শাস্তির সুযোগই আসত না। ফলে গবেষকেরা খুব স্পষ্টভাবে মাপতে পেরেছেন, বানররা কতবার কাজ শুরু করতেই ব্যর্থ হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে শাস্তির সম্ভাবনা থাকলে বানররা বেশি দ্বিধাগ্রস্ত থাকত। কিন্তু চিত্রটা বদলে যায় যখন গবেষকেরা জিনগত কৌশলে ভেন্ট্রাল স্ট্রায়াটাম থেকে ভেন্ট্রাল প্যালিডামের সংকেত দমন করেন। শুধু পুরস্কারযুক্ত কাজে এর তেমন প্রভাব পড়েনি। উপরন্তু শাস্তির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বানররা তখন অনেক বেশি আগ্রহ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। লক্ষণীয় বিষয়, পুরস্কার আর শাস্তির তুলনামূলক মূল্যায়ন কিন্তু বদলায়নি। বদলেছে শুধু ‘শুরু করার ইচ্ছা’। অর্থাৎ গবেষকেরা কার্যত সেই ‘অনুপরেরণা বাঁধ’-টাই খুলে দিতে সক্ষম হন। আচরণগত তথ্য ও বৈদ্যুতিক শারীরবৃত্তীয় রেকর্ডিং দেখায়, ভেন্ট্রাল স্ট্রায়াটাম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি শনাক্ত করে ভেন্ট্রাল প্যালিডামের কার্যকলাপ দমন করার ফলে কাজ শুরু করার প্রবণতা কমে যায়। গবেষকের কথায়, “ডিপ্রেশনে যে উদাসীনতা বা অনীহা দেখা যায়, তার কেন্দ্রে এই ভেন্ট্রাল প্যালিডাম থাকতে পারে।”

বর্তমানে অধিকাংশ থেরাপি নজর দেয় আনন্দ ফিরিয়ে আনা বা উদ্বেগ কমানোর দিকে। কিন্তু বহু রোগী জানান, তারা আনন্দ পান, তবু দাঁত ব্রাশ করা বা ইমেল লেখার কাজ শুরু করাটাই তাদের কাছে অসম্ভব বলে মনে হয়। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বিক্রম চিব বলেন, “নেটওয়ার্কের নির্দিষ্ট অংশে হস্তক্ষেপ করে সরাসরি কারণ-প্রভাব দেখাতে পারাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।“ পার্ল চিউ মনে করেন, এর প্রভাব পড়তে পারে সাইকোথেরাপিতেও। যেমন- কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপিকে আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তোলা। ভবিষ্যতে ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন বা নন-ইনভেসিভ আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে এই বর্তনীকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব হতে পারে, বলেন গবেষক আমেমোরি। তবে তিনি সতর্কও করে দেন। এই বাঁধ কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের সুরক্ষার জন্যই আছে। “অতিরিক্ত কাজ করাও তো বিপজ্জনক। এই সার্কিট আমাদের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচায়।“ অর্থাৎ প্রশ্নটা আর শুধু ‘কাজ করব কি না’ তার নিয়ে নয়, প্রশ্নটা হলো, মস্তিষ্ক কখন আমাদের থামিয়ে দেবে, আর কখন সেই ব্রেকটা আলতো করে ছেড়ে দেওয়া যাবে। এই ফলাফল যদি মানুষের ক্ষেত্রেও সঠিক প্রমাণিত হয়, তাহলে ডিপ্রেশনের চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

 

সূত্র: Can’t get motivated? This brain circuit might explain why — and it can be turned off; Nature.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 − one =