কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: উন্নতি ও আশঙ্কা 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: উন্নতি ও আশঙ্কা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২২ জানুয়ারী, ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ বাস্তব। কর্পোরেট অফিস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার সব জায়গাই একটাই কথা ঘুরছে, এআই তোমার চাকরি কেড়ে নেবে না, কিন্তু যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে, সে তোমাকে টপকে যাবে। নেচার জার্নালে সদ্য প্রকাশিত এক গবেষণা বলছে, এই কথাটা নিছক ভয় দেখানো নয়। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানের ভিতরে এটি বাস্তব বিভাজন তৈরি করে ফেলেছে। যেসব বিজ্ঞানী যেকোনো ধরনের এ আই নিয়ে কাজ করছেন, সেটা আশির দশকের প্রাথমিক মেশিন লার্নিং হোক বা আজকের জেনারেটিভ এ আই হোক না, তাঁরাই পেশাগত দৌড়ে এগিয়ে গেছেন। সংখ্যাটা চমকে দেওয়ার মতো। এ আই ব্যবহারকারী গবেষকরা গড়ে তিন গুণ বেশি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সাইটেশন পেয়েছেন আর তাঁরা কেরিয়ারে ‘নেতৃত্বের আসনে’পৌঁছেছেন আরও দ্রুত।

এই বিশাল গবেষণাটি করা হয়েছে ১৯৮০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার দশকের, ৪ কোটি ১০ লক্ষেরও বেশি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করে। জীববিজ্ঞান, চিকিৎসা, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, ভূবিজ্ঞান সব ক্ষেত্রই গবেষণাটির আওতায় আনা হয়েছে। প্রথম সমস্যা, কোন গবেষণায় এ আই ব্যবহার হয়েছে, সেটা চিহ্নিত করা। কারণ “এআই” মানে শুধু ChatGPT নয়, এর মধ্যে পড়ে পুরনো অ্যালগরিদম থেকে শুরু করে আধুনিক লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল সবই আছে। ব্যাপারটা একটু আত্মপরিহাসমূলক। গবেষকরা এ আই দিয়েই এ আই খুঁজছেন ! একটি ভাষা মডেলকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রবন্ধের শিরোনাম ও সারাংশ স্ক্যান করানো হয়। তাতেই দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৩ লক্ষ ১০ হাজার প্রবন্ধ চিহ্নিত হয় যেগুলিতে এ আই ব্যবহারের সম্ভাবনা বেশি। মানব বিশেষজ্ঞদের যাচাইয়ে দেখা যায়, মডেলটি প্রায় নির্ভুল। তারপর শুরু হয় আসল হিসেব-নিকেশ। তিনটি যুগে, মেশিন লার্নিং (১৯৮০–২০১৪), ডিপ লার্নিং (২০১৬–২০২২), এবং জেনারেটিভ এআই (২০২৩)-নির্ভর প্রবন্ধগুলি প্রতি বছর প্রায় দ্বিগুণ সাইটেশন পেয়েছে। এ আই ব্যবহারকারী বিজ্ঞানীরা শুধু বেশি পেপার প্রকাশ করেছেন তাই নয়, তাঁরা একাডেমিয়া ছেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কম নিয়েছেন। প্রায় দেড় বছর আগে এনারাই “লিডার” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন বড় ছবিটা দেখা হয়। এ আই-চালিত গবেষণা বিজ্ঞানের বিষয়বৈচিত্র্য কমিয়ে দিচ্ছে। এই প্রবন্ধগুলি সাধারণ গবেষণার তুলনায় ৪.৬ শতাংশ কম ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করছে। কেন? কারণ এক ধরনের প্রতিক্রিয়া চক্র তৈরি হচ্ছে। জনপ্রিয় সমস্যা → বড় তথ্যসেট → এ আই ব্যবহার করা সহজ → আরও বিজ্ঞানী সেই একই সমস্যার দিকে আকৃষ্ট হতে থেকেছেন। গবেষক জেমস ইভান্সের ভাষায়, “আমরা প্যাক প্রাণীর মতো আচরণ করছি।“ এর প্রভাব পড়ছে গবেষণার আন্তঃসংযোগেও। বিজ্ঞান সাধারণত এগোয় ঘন সাইটেশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। একটি কাজ হয় আরেকটির উপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু এ আই-চালিত গবেষণায় এই সংযোগ ২২ শতাংশ কম লক্ষ্য করা গেছে। কয়েকটি ‘সুপারস্টার’ পেপার, যেমন- ‘আলফাফোল্ড’ সব মনোযোগ শুষে নিচ্ছে। মোট প্রবন্ধের এক-চতুর্থাংশেরও কম অংশ পাচ্ছে ৮০ শতাংশ সাইটেশন। যেন সবাই একই পাহাড়ে উঠছে, কিন্তু পাশের উপত্যকাগুলি অনাবিষ্কৃতই থেকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদ লিসা মেসেরি বলেছেন, “জোরালো বিপদ সংকেত।“ তাঁর কথায়, “বিজ্ঞান একেবারেই সমষ্টিগত প্রচেষ্টা। এমন একটি সরঞ্জাম যদি ব্যক্তিকে লাভবান করে বিজ্ঞানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে আত্মসমালোচনা জরুরি।“ সমাধান আছে। একদিকে, যেসব ক্ষেত্রে এখনও পর্যাপ্ত তথ্য নেই, সেখানে বড় ও উন্নত তথ্য-ভাণ্ডার তৈরি করা দরকার। অন্যদিকে, ভবিষ্যতের এ আইকে শুধু ডেটা হজম যন্ত্র নয়, সৃজনশীল বৈজ্ঞানিক সহচর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তবে সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আমাদেরই।

 

সূত্র: Scientific Community AI has supercharged scientists—but may have shrunk science.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 − 3 =