কৃবু চিনল ডাইনোসরের পদচিহ্ন 

কৃবু চিনল ডাইনোসরের পদচিহ্ন 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

ডাইনোসরের পায়ের ছাপ জীবাশ্মবিদ্যার ইতিহাসে একদিকে যেমন অমূল্য দলিল, অন্যদিকে তেমনই এক দীর্ঘস্থায়ী বিভ্রান্তির উৎস। কারণ একটি পায়ের ছাপ কেবল একটি পায়ের স্থির ছাপ নয়; এটি একটি গতিশীল মুহূর্তের রেকর্ড। নরম কাদায় পা বসার সময় মাটি চেপে যাওয়া, আঙুল সরে যাওয়া, প্রান্ত ভেঙে পড়া, এমনকি হাজার হাজার বছরের ক্ষয়—সব মিলিয়ে একটি ছাপ ক্রমাগত রূপ বদলায়। ফলে একই ধরনের ডাইনোসরও ভিন্ন পরিবেশে সম্পূর্ণ আলাদা রকম ছাপ রেখে যেতে পারে। এই কারণেই শত বছরের বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীরা একই পায়ের ছাপ দেখে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে এসেছেন। কখনো মনে হয়েছে এটি কি শিকারি ডাইনোসরের, নাকি তৃণভোজীর?

এই জটিল সমস্যার সমাধানে নতুন সম্ভাবনা দেখিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (কৃবু)। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন ডাইনো ট্রাকার নামে একটি এআই-ভিত্তিক মোবাইল অ্যাপ, যেখানে ডাইনোসরের পায়ের ছাপের ছবি বা এমনকি হাতে আঁকা স্কেচ আপলোড করলেই অ্যাপটি জানাতে পারে—সম্ভাব্য কোন ধরনের ডাইনোসর সেই ছাপ রেখে গিয়েছিল।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন জার্মানির বার্লিনে অবস্থিত হেলমহোল্টজ রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানীরা, যাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এডিনবরার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও। তাঁরা প্রচলিত পদ্ধতির মতো পায়ের ছাপকে জোর করে নির্দিষ্ট শ্রেণিতে ভাগ না করে, এআই-কে শেখান বাস্তবে পায়ের ছাপ কীভাবে নানা কারণে পরিবর্তিত হয়। প্রায় ২,০০০টি বাস্তব জীবাশ্ম পায়ের ছাপের পাশাপাশি এআইকে শেখানো হয়েছে লক্ষ লক্ষ কৃত্রিমভাবে তৈরি বিকৃত ছাপ। যেখানে চাপ, প্রান্ত সরে যাওয়া, মাটির বসে যাওয়ার মতো প্রাকৃতিক পরিবর্তন অনুকরণ করা হয়েছে।

এই প্রশিক্ষণের ফলে এআই পায়ের ছাপের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, যেমন- আঙুল কতটা ছড়ানো, গোড়ালি কোথায় বসেছে, পায়ের সংস্পর্শের ক্ষেত্রফল কত বড়, কিংবা হাঁটার সময় ওজন কীভাবে বণ্টিত হয়েছে – তার ধরণ চিহ্নিত করতে শিখেছে। এছাড়া দেখা গেছে, এই এআই প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে মানব বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হয়েছে, এমনকি বিতর্কিত নমুনার ক্ষেত্রেও।

সবচেয়ে চমকপ্রদ ফল এসেছে ২০ কোটিরও বেশি বছর পুরোনো কিছু পায়ের ছাপ বিশ্লেষণ থেকে, যেখানে এআই পাখির পায়ের মতো বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছে। এতে নতুন প্রশ্ন উঠেছে—পাখির উৎপত্তি কি আমরা যা ধারণা করেছিলাম তার চেয়ে অনেক আগেই শুরু হয়েছিল, নাকি কিছু প্রাচীন ডাইনোসরের পা কাকতালীয়ভাবে পাখির মতো ছিল? স্কটল্যান্ডের আইল অব স্কাই থেকে পাওয়া রহস্যময় পায়ের ছাপগুলোর ক্ষেত্রেও নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছে। এআই ইঙ্গিত দিচ্ছে, এগুলো হয়তো হংসচঞ্চু বিশিষ্ট ডাইনোসরের আদিম আত্মীয়দের হতে পারে। এই ফল ডাইনোসরের বিস্তার ও বিবর্তনের সময়রেখা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।

তবে ডাইনো-ট্র্যাকার কোনো বিতর্কের চূড়ান্ত সমাধান নয়। কিন্তু এটি একটি শক্তিশালী, তথ্যনির্ভর দ্বিতীয় অভিমত। যেখানে বিশৃঙ্খল ছাপকেই এতদিন সমস্যা মনে করা হতো, সেখানে এআই দেখিয়ে দিচ্ছে—এই বিশৃঙ্খলাই আসলে অতীতের সবচেয়ে মূল্যবান সংকেত।

 

সূত্র: AI is learning how to identify dinosaur footprints ByAndrei Ionescu, Earth.com, 27th January 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 5 =