কৃষিজমিতে নির্বিচার বৃক্ষরোপণের কুপরিণাম

কৃষিজমিতে নির্বিচার বৃক্ষরোপণের কুপরিণাম

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ মার্চ, ২০২৬

বৃক্ষরোপণ নিঃসন্দেহে প্রকৃতির জন্য উপকারী। এমনটাই তো আমরা এতদিন জেনে এসেছি, ভেবে এসেছি। কিন্তু প্রকৃতি তো সব সময় সরল সমীকরণে চলে না। জাপানের এক গবেষণা দেখাচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া পোঁতা গাছের সারি কখনও কখনও পাখিদের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং বাধা হয়ে উঠতে পারে। এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছে হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয় , এবং ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট পত্রিকায়।

বিশ্বজুড়ে কৃষি-পরিবেশ নীতিতে রক্ষাবন্ধনী (‘শেল্টারবেল্ট’) – অর্থাৎ বাতাস ঠেকাতে বা জমি রক্ষার জন্য লাগানো গাছের সরু সারি—জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধির কার্যকর উপায় হিসেবে প্রচারিত। ধারণা ছিল, এই গাছপালা পাখিদের বাসা বাঁধার জায়গা, খাদ্য ও আশ্রয় দেবে। কিন্তু মধ্য জাপানের কাহোকুগাতা হ্রদ-সংলগ্ন কৃষি জলাভূমিতে করা ক্ষেত্র সমীক্ষা এক ভিন্ন ছবি তুলে ধরেছে।

এই অঞ্চলটি মূলত ধানক্ষেত, পদ্মচাষের জমি, চাষযোগ্য ফসলের ক্ষেত ও চরভূমি নিয়ে গঠিত। শীতকালে প্রবল ঝড়ো হাওয়া থেকে ফসল রক্ষার জন্য এখানে গাছের সারি লাগানো হয়। এছাড়াও এই এলাকা পূর্ব এশিয়া-অস্ট্রেলেশিয়া অভিবাসন পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরতিস্থল। শীতকালে বহু পরিযায়ী পাখি এখানে আশ্রয় নেয়, আবার গ্রীষ্মে প্রজননকারী প্রজাতিও আসে। এখানে প্রায় ৩০০ প্রজাতির পাখির উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে। গবেষকেরা ২০২১ ও ২০২৩ সালে পয়েন্ট-কাউন্ট পদ্ধতিতে পাখির সংখ্যা ও বৈচিত্র্য পরিমাপ করেন।

দেখা গেছে সুরক্ষাবন্ধনী, ঝোপঝাড় ও প্রান্তভিত্তিক পাখিদের সংখ্যা বাড়ালেও, খোলা ঘাসভূমি-নির্ভর প্রজাতির উপস্থিতি প্রায় ৭০–৭৪ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে যারা খোলা জমিতে বাসা বাঁধে ও খাদ্য সংগ্রহ করে, তাদের জন্য গাছের এইসব সরু সরু সারি ব্যবহারযোগ্য আবাসভূমি সংকুচিত করে এবং শিকারির ঝুঁকি বাড়ায়। সুরক্ষাবন্ধনীর পাশের এলাকায় ঘাসভূমির পাখির সংখ্যা খোলা জমির তুলনায় কম ছিল। প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গেলে তবেই পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

গবেষকেরা বলছেন, প্রশ্নটি গাছ লাগানো ভালো না খারাপ তা নয়; বরং গাছ কোথায়, কীভাবে এবং কতটা লাগানো হচ্ছে, সেটাই মূল বিষয়। জলাভূমি-নির্ভর প্রজাতিগুলোর জন্য খোলা প্রান্তর অপরিহার্য। সেখানে নির্বিচারে বৃক্ষরোপণ করলে আবাসভূমি সংকুচিত হয় এবং শিকারির ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই কৃষি-পরিবেশ নীতিতে একমাত্র সমাধান হিসেবে সর্বত্র গাছ লাগানোর বদলে, ভূ-চরিত্র ভিত্তিক পরিকল্পনা দরকার। খোলা জমি ও গাছপালার বৈশিষ্ট্য সুষমভাবে মেলানো দরকার ।

সংরক্ষণ নীতি কেবল শুভ ইচ্ছার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। অনেকসময় ছোট ছোট পরিবর্তনও বড় পরিবেশগত প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষিজ জলাভূমি যেমন একদিকে মানুষের খাদ্য জোগায়, অন্যদিকে এটি হাজারো পাখির জীবনচক্রের অংশ। খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিজ জলাভূমিকে যদি বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবেও টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে প্রমাণভিত্তিক ও স্থাননির্ভর পরিকল্পনাই হবে ভবিষ্যতের সঠিক পথ।

 

সূত্র: “Shelterbelts support edge birds but limit grassland and wetland specialists in agricultural landscape” by Masumi Hisano, Shota Deguchi, et.al; 8th January 2026, published in Journal of Environmental Management.

DOI: 10.1016/j.jenvman.2026.128583

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven + nineteen =