কেমোথেরাপির বহুমুখী উপকারিতা

কেমোথেরাপির বহুমুখী উপকারিতা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

কেমোথেরাপি মানেই বমি, দুর্বলতা, চুল পড়া আর সঙ্গে অন্ত্রের ভেতরের আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এতদিন এই ক্ষতকে দেখা হত একেবারে ‘স্থানীয় ক্ষতি’ হিসেবেই। পেটের ভেতরের সমস্যা, পেটেই শেষ। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, কেমোথেরাপি আসলে অন্ত্র থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আর ক্যানসারের ছড়িয়ে পড়া সবকিছুকেই একসঙ্গে নাড়িয়ে দেয়। কেমোথেরাপির আঘাতে যখন অন্ত্রের আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন বদলে যায় অন্ত্রের ভেতরের পুষ্টির মানচিত্র। কোন পুষ্টি কোথায় আছে, কীভাবে শোষিত হচ্ছে এ সবই পাল্টে যায়। আর এই বদলে যাওয়া পরিবেশে মানিয়ে নিতে বাধ্য হয় অন্ত্রের বাসিন্দা ব্যাকটেরিয়া। এবং তারা শুধু টিকে থাকে না, নিজেদের আচরণও বদলে ফেলে। গবেষকরা দেখেছেন, এই পরিস্থিতিতে আন্ত্রিক অণুজীব সমষ্টির গঠন ও কার্যকলাপে বড় রকমের পরিবর্তন আসে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটা হল, একটি বিশেষ রাসায়নিকের উৎপাদন বেড়ে যাওয়া : ইনডোল-৩-প্রোপিওনিক অ্যাসিড, সংক্ষেপে IPA। এটি ট্রিপটোফ্যান নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে ব্যাকটেরিয়া তৈরি করে। আই পি এ শুধু অন্ত্রেই আটকে থাকে না। এটি এক ধরনের জৈবিক সংকেতের মতো কাজ করে। যা রক্তের মাধ্যমে শরীরের ভেতর ভ্রমণ করে পৌঁছে যায় অস্থিমজ্জাতেও। এখানে ইমিউন সিস্টেমের কোষ তৈরি হয়। সেখানে পৌঁছে আই পি এ সরাসরি প্রভাব ফেলে ইমিউন কোষ তৈরির প্রক্রিয়ায়, বিশেষ করে ‘মাইলোপোয়েসিসে’। এর ফলে কমে যায় এক বিশেষ ধরনের ইমিউন দমনকারী কোষ, তার নাম ইমিউনো-সাপ্রেসিভ মনোসাইট। এই মনোসাইটগুলো সাধারণত ক্যানসারের জন্য সুবিধাজনক। তারা টিউমারকে ইমিউন সিস্টেমের চোখ এড়াতে সাহায্য করে এবং মেটাস্টেসিস, অর্থাৎ ক্যানসারের ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া, আরও সহজ করে তোলে। আই পি এ বাড়লে এই ‘সহযোগী’ কোষগুলোর উৎপাদন কমে যায়। প্রধান গবেষক লুডিভিন বারসিয়ে বলছেন, “আমরা অবাক হয়ে গেছি। কেমোথেরাপির এমন এক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, যাকে এতদিন নিছক ক্ষতি হিসেবে দেখা হত, সেটাই কিনা এমন সংগঠিত একটি সিস্টেম ঘটিত প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে! আন্ত্রিক অণুজীব সমষ্টিকে বদলে দিয়ে কেমোথেরাপি একের পর এক ঘটনা ঘটাতে শুরু করে দেয়, যা ইমিউন সিস্টেমকে নতুন করে সাজিয়ে তোলে এবং শরীরকে মেটাস্টাসিসের জন্য কম অনুকূল করে।“ এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু অস্থিমজ্জাতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাবে টি-সেলের কার্যক্ষমতা বাড়ে, ইমিউন কোষগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ বদলে যায় – বিশেষ করে সেই অঙ্গগুলোতে, যেখানে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। লিভারে এই প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট। প্রি-ক্লিনিক্যাল মডেলে দেখা গেছে, এই নতুন ইমিউন পরিবেশ লিভারে মেটাস্টাসিস গড়ে ওঠার বিরুদ্ধে একধরনের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ তৈরি করে। ল্যাবের এই ফলাফল শুধু কাগজে-কলমে আটকে নেই, রোগীদের তথ্যেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। জেনেভা ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের চিকিৎসক থিবো কোয়েসলারের সঙ্গে যৌথভাবে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেন, কোলোরেক্টাল ক্যানসারের যেসব রোগীর কেমোথেরাপির পর রক্তে আই পি এ -এর মাত্রা বেশি, তাঁদের মনোসাইটের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। আর এই ইমিউন বৈশিষ্ট্য ক্যানসারের হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার সঙ্গে ভালোভাবে যুক্ত। গবেষক তাতিয়ানা পেত্রোভা বলছেন, “এই কাজ থেকে দেখা যায়, কেমোথেরাপির প্রভাব শুধু টিউমারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্ত্র, অস্থিমজ্জা আর মেটাস্টেসিসের জায়গাগুলোর মধ্যে যে কার্যকর অক্ষটি সক্রিয় থাকে, সেটাকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে। এই সিস্টেম ঘটিত ক্রিয়া কৌশলগুলোকে ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া আটকানোর কাজে লাগানো যেতে পারে।“ আসলে কেমোথেরাপি হয়তো শরীরে এক ধরনের ‘জৈবিক স্মৃতি’ তৈরি করে। এই স্মৃতি গড়ে ওঠে আন্ত্রিক ব্যাকটেরিয়ার তৈরি বিপাকীয় উপাদানের মাধ্যমে, যা দীর্ঘদিন ধরে মেটাস্টাসিস দমন করতে পারে। সব মিলিয়ে, এই গবেষণা এক নতুন অক্ষের কথা বলছে।অন্ত্র-অস্থিমজ্জা –লিভার- মেটাস্টেসিস অক্ষ। এটি দেখায়, কেমোথেরাপি কীভাবে পুরো শরীর জুড়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে অণুজীব সমষ্টির বিপাক-জাত উপাদানকে ক্যানসার চিকিৎসার সহায়ক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

সূত্র: Chemotherapy-driven intestinal dysbiosis and indole-3-propionic acid rewire myelopoiesis to promote a metastasis-refractory state. Nature Communications

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 4 =