কোভিড–১৯ টিকাকরণের ইতিহাসে সাফল্যের গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে এক বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ছায়া। যার নাম ভ্যাকসিন–ইনডিউসড ইমিউন থ্রম্বোসাইটোপেনিয়া অ্যান্ড থ্রম্বোসিস (ভি আই টি টি)। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ বাঁচানো অ্যাডেনোভাইরাসভিত্তিক টিকা নেওয়ার পর অতি অল্পসংখ্যক মানুষের শরীরে কেন হঠাৎ মারাত্মক রক্ত জমাট বাধছিল? এই বিশেষ পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াটি বছরের পর বছর বিজ্ঞানীদের ধাঁধায় ফেলেছিল। অবশেষে ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয় (কানাডা), ফ্লিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয় (অস্ট্রেলিয়া) এবং ইউনিভার্সিটি গ্রিফসওয়াল্ড (জার্মানি) -এর গবেষকদের যৌথ প্রচেষ্টায় মিলেছে সেই বহু প্রতীক্ষিত ব্যাখ্যা। গবেষণার বিবরণটি প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পত্রিকা নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনে।
গবেষণায় দেখা গেছে, খুব অল্পসংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে শরীরের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজস্ব রক্তের প্রোটিনের বিরুদ্ধেই আক্রমণ চালায়। অ্যাডেনোভাইরাসের একটি প্রোটিন, প্রোটিন সপ্ত (pVII), দেখতে অনেকটাই মানুষের রক্তে থাকা প্লেটলেট ফ্যাক্টর চার (PF4)–এর মতো। ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শরীর pVII–এর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। কিন্তু অত্যন্ত বিরল কিছু পরিস্থিতিতে সেই অ্যান্টিবডি হঠাৎ লক্ষ্যচ্যুত হয়ে PF4–কে আক্রমণ করতে শুরু করে। তখনই শুরু হয় বিপদ। প্লেটলেট অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হয়ে রক্তনালিতে জমাট বাধে, আর একই সঙ্গে রক্তে প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যায়।
তবে এই ভুল সবার ক্ষেত্রে ঘটে না। গবেষকেরা দেখেছেন, IGLV3-21*02 বা *03 নামের একটি নির্দিষ্ট প্রকারের অ্যান্টিবডি–জিন থাকলে তবেই ওই সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু শুধু ওই জিন থাকলেই নয়। অ্যান্টিবডি তৈরির সময় একটি ক্ষুদ্র, আকস্মিক পরিব্যক্তি (K31E) ঘটা প্রয়োজন, যা একটিমাত্র অ্যামিনো অ্যাসিডকে বদলে দেয়। এই ক্ষুদ্র পরিবর্তনই অ্যান্টিবডির গন্তব্য ঘুরিয়ে দেয়। আশ্চর্যজনকভাবে, বিশ্লেষণ করা প্রতিটি VITT রোগীর অ্যান্টিবডিতে একই পরিব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। ল্যাবরেটরিতে এই পরিব্যক্তিটি উল্টে দিলেই ক্ষতিকর জমাট বাঁধার ক্ষমতা হারিয়ে যায়—যা প্রমাণ করে এই একক পরিবর্তনই রোগটির মূল চালিকা শক্তি।
অ্যান্টিবডি সিকোয়েন্সিং, ম্যাস স্পেকট্রোমেট্রি এবং মানবায়িত ইঁদুর–মডেলের মাধ্যমে গবেষকেরা এই প্রক্রিয়াকে আণবিক সূক্ষ্মতায় তুলে ধরেছেন। তাদের আবিষ্কার শুধু একটি বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার রহস্য উন্মোচন করেনি; এটি দেখিয়েছে কীভাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সূক্ষ্ম ভারসাম্য নষ্ট হলে আত্মঘাতী প্রতিক্রিয়া জন্ম নিতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এখন বিজ্ঞানীরা জানেন সমস্যার উৎস কোথায়। এই আবিষ্কার VITT–সম্পর্কিত বহু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে: কেন অ্যাডেনোভাইরাসভিত্তিক টিকা বা সংক্রমণ এটি ঘটাতে পারে, কেন PF4 লক্ষ্যবস্তু হয়, কেন এই ঘটনা এত বিরল, এবং কেন কিছু জনগোষ্ঠীতে এর হার ভিন্ন। সবচেয়ে বড় কথা, এর ফলে ভবিষ্যতের অ্যাডেনোভাইরাসভিত্তিক টিকা এমনভাবে নকশা করা সম্ভব হবে, যাতে কার্যকারিতা অক্ষুণ্ণ রেখে এই বিরল ইমিউন বিভ্রান্তিকে এড়ানো যায়। মহামারির অন্ধকার অধ্যায় থেকে উঠে এল বিজ্ঞানের এক আলোকরেখা, যা টিকার নিরাপত্তা, নির্মাণ নকশা এবং আমজনতার আস্থাকে আরও দৃঢ় ভিত্তি দেবে।
সূত্র: “Adenoviral Inciting Antigen and Somatic Hypermutation in VITT” by Jing Jing Wang, Linda Schönborn, et.al; 11th February 2026, New England Journal of Medicine.
DOI: 10.1056/NEJMoa2514824
