কোষঝিল্লি ও ন্যানোবিদ্যুৎ উৎপাদন

কোষঝিল্লি ও ন্যানোবিদ্যুৎ উৎপাদন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৬ জানুয়ারী, ২০২৬

জীবনের সবচেয়ে মৌলিক একক হল কোষ। নতুন গবেষণা বলছে, কোষ শুধুমাত্র এক রাসায়নিক কারখানা নয়, এর ঝিল্লি নিজেই হতে পারে ক্ষুদ্র এক ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদক। জীবনের ভিতরে বিদ্যুৎ শুধু স্নায়ু বা পেশিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বিদ্যুৎ তৈরির খেলাটা শুরু হয় কোষের দেওয়াল থেকেই। স্কুলের জীববিজ্ঞানে আমরা শিখেছি, কোষ ঝিল্লির কাজ খুব সোজা: কোষের ভিতর ও বাইরে কি ঢুকবে, কি বেরোবে তা নিয়ন্ত্রণ করা। এ যেন এক ধরনের নিষ্ক্রিয় সীমান্তরেখা। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। বিজ্ঞানীরা দেখাচ্ছেন, কোষ ঝিল্লি আসলে স্থির নয়। কোষের ভিতরে প্রতিনিয়ত রাসায়নিক বিক্রিয়া চলছে। প্রোটিন তৈরি হচ্ছে, শক্তি ব্যবহার হচ্ছে, অণু ভাঙছে-গড়ছে। এই সব কিছুর চাপ সরাসরি পড়ে কোষ ঝিল্লির উপর। ফলে ঝিল্লি সামান্য হলেও বাঁকে, দোলে, কাঁপে। আর এই সামান্য কাঁপুনিই হল বড় রহস্যের চাবিকাঠি। পদার্থবিজ্ঞানে একটি পরিচিত ধারণা হল ‘নমনীয়তা বিদ্যুৎ’(ফ্লেক্সো- ইলেক্ট্রিসিটি)। সহজ করে বললে, কোনো বস্তু যদি বাঁকে বা বিকৃত হয়, তাহলে তার ভিতরে বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি হতে পারে। আমরা সাধারণত এর নিদর্শন পাই কৃত্রিম উপাদান বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রে। গবেষকরা দেখাচ্ছেন, কোষ ঝিল্লিতেও ওই একই ঘটনা ঘটতে পারে। যখন ঝিল্লি কাঁপে বা বাঁকে, তখন তার দুই পাশে থাকা বৈদ্যুতিক চার্জের বণ্টন বদলে যায়। এর ফলে ঝিল্লির দুই পাশে তৈরি হয় ভোল্টেজের পার্থক্য। কিছু ক্ষেত্রে এই ভোল্টেজ প্রায় ৫০ থেকে ৯০ মিলিভোল্ট পর্যন্ত হতে পারে – যা স্নায়ুকোষে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সংকেতের কাছাকাছি। অর্থাৎ, কোষ ঝিল্লি নিজেই যেন এক ধরনের ন্যানো-জেনারেটর। এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে এটি জীবনের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধারণাটাকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এতদিন জানা ছিল,বিদ্যুৎ মানে কেবলই স্নায়ু কোষ, সংকেত মানে আয়ন চ্যানেল আর শক্তি মানেই এটিপি (অ্যাডিনোসিন ট্রাই ফসফেট)। কিন্তু এই গবেষণা বলছে, কোষের ঝিল্লি নিজেই বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে – কোনো বিশেষ স্নায়বিক কাঠামো ছাড়াই! এর মানে, কোষ হয়তো নিজের ভিতরেই বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আয়ন (যেমন- সোডিয়াম বা ক্যালসিয়াম) চলাচলে ঝিল্লির এই বিদ্যুতের ভূমিকা থাকতে পারে। কোষের যোগাযোগ ব্যবস্থা আসলে অনেক বেশি জটিল। সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন হলো, এই প্রক্রিয়া কি শুধু স্নায়ুকোষেই সীমাবদ্ধ? গবেষকরা বলছেন, না। যেকোনো জীবন্ত কোষে, যেখানে অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ আছে, সেখানেই ঝিল্লির নড়াচড়া হবে। তার মানে, বিদ্যুৎ তৈরির এই ক্ষুদ্র প্রক্রিয়া প্রায় সব জীবের মধ্যেই থাকতে পারে। ভবিষ্যতে কোষকলা স্তরে বৈদ্যুতিক সমন্বয়, কোষ বিভাজন বা ক্ষত সারানোর সময় বৈদ্যুতিক সংকেত এমনকি প্রাথমিক জীবনে বিদ্যুতের ভূমিকা ব্যাখ্যা করার কাজে এটি সাহায্য করতে পারে। তবে এই গবেষণা এখনও মূলত তাত্ত্বিক মডেলের উপর দাঁড়িয়ে। পরবর্তী ধাপ হবে পরীক্ষাগারে সরাসরি এই ঝিল্লি-উৎপন্ন বিদ্যুৎ মাপা। যদি প্রমাণিত হয়,তাহলে এর প্রভাব শুধু জীববিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এ থেকে তৈরি হতে পারে জীব-প্রণোদিত স্মার্ট উপাদান, ক্ষুদ্র শক্তি সংগ্রহকারী যন্ত্রকৌশল, এমনকি নতুন ধরনের জৈব-ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি। জীবন তো শুধু রাসায়নিক সমীকরণ নয়, জীবনের ভিতরে চলছে অবিরাম যান্ত্রিক, বৈদ্যুতিক ও শক্তির খেলা। কোষ ঝিল্লি আর নিষ্ক্রিয় প্রাচীর নয়, এটি হয়তো জীবনের সব থেকে ক্ষুদ্র, অথচ সবচেয়ে সক্রিয় বিদ্যুৎকেন্দ্র।

 

সূত্র: “Flexoelectricity and the fluctuations of (active) living cells: Implications for energy harvesting, ion transport, and neuronal activity” by Pratik Khandagale, Liping Liu and Pradeep Sharma, 16 December 2025, PNAS Nexus

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 4 =