ক্যানসার-নাশক ব্যাকটেরিয়া 

ক্যানসার-নাশক ব্যাকটেরিয়া 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৭ জানুয়ারী, ২০২৬

ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজ্ঞানীরা একেবারে নতুন এক অস্ত্রের সন্ধান পেয়েছেন জাপানি গেছো ব্যাঙের অন্ত্র নিবাসী ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই ব্যাঙের শরীরে থাকা একটি বিশেষ ব্যাকটেরিয়া ইঁদুরের শরীরে ক্যানসারের টিউমার সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। কোনো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন জাপান অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বিজ্ঞানীরা। তাদের আগ্রহের কারণ ছিল একটি পরিচিত কিন্তু কম আলোচিত তথ্য—উভচর প্রাণী ও সরীসৃপদের মধ্যে ক্যানসারের হার অত্যন্ত কম। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, এর পেছনে তাদের অন্ত্রের অণুজীব সমষ্টির ভূমিকা থাকতে পারে।

এই ধারণা যাচাই করতে গবেষকরা ব্যাঙ, গোসাপ ও টিকটিকি থেকে সংগৃহীত মোট ৪৫টি ভিন্ন ব্যাকটেরিয়াল স্ট্রেন পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে ৯টি স্ট্রেন টিউমার দমনে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা দেখায়। তবে সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে উঠে আসে জাপানি গেছো ব্যাঙের একটি ব্যাকটেরিয়া—ইউইংগেলা আমেরিকানা।

ইঁদুরের শরীরে একবার এই ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করার পর টিউমার কেবল ছোটই হয়নি, সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছে। আরও আশ্চর্যের বিষয়, ৩০ দিন পর পুনরায় ক্যানসার কোষ প্রবেশ করালেও ওই ইঁদুরদের শরীরে আর টিউমার গড়ে ওঠেনি। অর্থাৎ, এটি শুধু চিকিৎসা নয়, ভবিষ্যৎ ক্যানসারের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ই.আমেরিকানা দুইভাবে কাজ করে। প্রথমত, এটি সরাসরি টিউমার টিস্যু আক্রমণ করে। দ্বিতীয়ত, এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে তোলে—বিশেষ করে টি-সেল, বি-সেল ও নিউট্রোফিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইমিউন কোষগুলোকে।

এই ব্যাকটেরিয়ার বিশেষ ক্ষমতার একটি কারণ হলো কম অক্সিজেনযুক্ত পরিবেশে টিকে থাকার দক্ষতা। ক্যানসারের টিউমার সাধারণত এমনই পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে অনেক ওষুধ ও অনাক্রম্য কোষ কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না। কিন্তু ই. আমেরিকানা ঠিক এই দুর্বলতাকেই নিজের শক্তিতে পরিণত করেছে।

প্রাথমিক পরীক্ষায় ব্যাকটেরিয়াটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলেও দেখা গেছে। এটি দ্রুত ইঁদুরের রক্ত থেকে পরিষ্কার হয়ে গেছে, কোনো স্থায়ী বিষক্রিয়া সৃষ্টি করেনি এবং সুস্থ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করেনি। এমনকি এটি কেমোথেরাপির প্রচলিত ওষুধ ডক্সোরুবিসিনের চেয়েও বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি বর্তমানে প্রাণীর ওপরেই পরীক্ষা করা হয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করার আগে দীর্ঘ ও কঠোর নিরাপত্তা পরীক্ষা প্রয়োজন, কারণ ই.আমেরিকানা মানুষের শরীরে সংক্রমণও ঘটাতে পারে।

প্রকৃতির বৈচিত্র্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের চিকিৎসার অসীম সম্ভাবনা। ব্যাঙ ও অন্যান্য প্রাণীর অণুজীব শুধু পরিবেশের অংশ নয়, তারা হয়তো হতে পারে আগামী দিনের ক্যানসার-নাশক শক্তিশালী অস্ত্র।

 

সূত্র: Powerful Anti-Cancer Drug Discovered Inside Japanese Tree Frog ByDavid Nield, The research has been published in Gut Microbes. 26th December 2025.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 4 =