খাদ্য-সংক্রান্ত অবচেতন সিদ্ধান্ত 

খাদ্য-সংক্রান্ত অবচেতন সিদ্ধান্ত 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১২ জানুয়ারী, ২০২৬

বহু বছর ধরে স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক আলোচনায় একটি সাড়া জাগানো দাবি ঘোরাফেরা করছে —মানুষ নাকি প্রতিদিন নিজের অজান্তেই অবচেতনে ২০০টিরও বেশি খাদ্য-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন গবেষণা বলছে, এই সংখ্যা মানুষের আচরণের বাস্তব প্রতিফলন নয়; এটি আসলে ভুল গণনা-পদ্ধতির ফল।

জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউট ফর হিউম্যান ডেভলপমেন্টের গবেষকেরা দেখিয়েছেন, এই বহুল প্রচলিত ধারণা মানুষের খাদ্য-নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেয়। গবেষণা পত্রের অন্যতম লেখক মারিয়া আলমুদেনা ক্লাসেনের মতে, এই সংখ্যা এমন একটি বিভ্রম তৈরি করে যেন মানুষ খাবার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় অসহায়—যেন সব সিদ্ধান্তই অচেতন ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘটে।

এই ‘২০০ খাদ্য-সিদ্ধান্ত’ ধারণার উৎস খুঁজতে গেলে যেতে হয় ২০০৭ সালের একটি মার্কিন গবেষণায়। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে সরাসরি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—তারা দিনে কতবার খাওয়া-দাওয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন? অর্থাৎ তারা তাদের পছন্দ অনুসারে কি কি খাবার বেছে নেন?। গড় উত্তর ছিল মাত্র ১৪টি। কিন্তু পরে একই বিষয়কে ভেঙে ভেঙে প্রশ্ন করা হয়—কখন খাবেন, কী খাবেন, কতটা খাবেন, কোথায় খাবেন এবং কার সঙ্গে খাবেন। এই ছোট ছোট হিসাবগুলো যোগ করে দৈনিক প্রায় ২২৭টি সিদ্ধান্তের সংখ্যা দাঁড় করানো হয়।

তৎকালীন গবেষকেরা এই বড় পার্থক্যকে “অচেতন বা মনোযোগহীন সিদ্ধান্ত”-এর প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা বলছেন, এটি আসলে একটি পরিচিত মানসিক বিভ্রান্তির উদাহরণ। একে বলে উপাংশ-ভিত্তিক অতিমূল্যায়ন প্রভাব। অর্থাৎ খণ্ডে ভাবলে বেশি মনে হওয়ার মানসিক প্রবণতা। একটি সামগ্রিক প্রশ্নকে অনেকগুলো খণ্ডে ভেঙে নিলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই মোট সংখ্যাটাকে অতিরঞ্জিত করে।

এর ফল শুধু সংখ্যার বিভ্রান্তি নয়; এর সামাজিক প্রভাবও গভীর। গবেষকদের মতে, এ ধরনের সরলীকৃত বার্তা মানুষের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস কমিয়ে দেয়। মানুষ ভাবতে শুরু করে, এতগুলো সিদ্ধান্ত যেহেতু অজান্তেই হচ্ছে, সচেতন পরিবর্তনের সুযোগ বুঝি খুবই সামান্য।

বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য-সিদ্ধান্ত সংখ্যা দিয়ে নয়, প্রাসঙ্গিকতা দিয়ে বোঝা উচিত। স্যালাড না পাস্তা বেছে নেওয়া, দ্বিতীয়বার পরিবেশন নেবেন কি না—এই কয়েকটি মূল সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের গতিপথ নির্ধারণ করে। লক্ষ্যভেদে সিদ্ধান্তের গুরুত্বও বদলে যায় । যেমন, কেউ ওজন কমাতে চাইলে রাতের খাবারের ধরনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আবার পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের ক্ষেত্রে উদ্ভিদভিত্তিক খাবার বেছে নেওয়াই মুখ্য।

গবেষকেরা তাই খাদ্য-আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে একাধিক গবেষণা-পদ্ধতির সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। যেমন, ডায়েরি স্টাডি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, গুণগত পর্যবেক্ষণ ও সাংস্কৃতিক তুলনা—এই সব পদ্ধতির সমন্বয়। পাশাপাশি তাঁরা স্ব-প্রণোদনার মতো বাস্তব কৌশলের কথা বলেছেন। অর্থাৎ নিজের পরিবেশ এমনভাবে সাজানো, যাতে স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। যেমন, ফল সামনে রাখা, মিষ্টি চোখের আড়ালে রাখা। আমাদের মন সারাদিন পছন্দ করে কটা খাবার বেছে নিল সেটা প্রকাশের মাধ্যম সংখ্যা নয়, বরং সচেতন ও অর্থবহ নির্বাচনই আমাদের খাবার এবং স্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে।

 

সূত্র : Think you make 200 food choices a day? Think again

The famous “200 food decisions a day” claim isn’t revealing hidden habits—it’s revealing a misleading way of counting. Materials provided by Max Planck Institute for Human Development, 5th January,2025.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve + 13 =