খুলিভেদী শব্দতরঙ্গ: চেতনার আঁধারে আলো?  

খুলিভেদী শব্দতরঙ্গ: চেতনার আঁধারে আলো?  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬

১৯৯৮ সালে স্নায়ু বিজ্ঞানী ক্রিস্টফ কখ আর দার্শনিক ডেভিড চ্যালমার্সের মধ্যে একটা বাজি হয়। কখের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ২৫ বছরের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা “চেতনার নিউরাল কোরিলেট” অর্থাৎ মস্তিষ্কের কোন জৈবিক কার্যকলাপ থেকে চেতনা জন্মায়, তা খুঁজে বের করবেন। তাঁর ধারণা ছিল, মানব অভিজ্ঞতার যা সবচেয়ে দুরূহ প্রশ্ন, তথাকথিত সেই ‘হার্ড প্রবলেম অফ কনশাসনেস’-এর সমাধানের দোরগোড়ায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি। তারপর ২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। বাজিটা কখ জিততে পারেননি। কয়েক বছর আগে নিউ ইয়র্কের এক সম্মেলন মঞ্চে তিনি পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে চ্যালমার্সকে এক বাক্স দামি ওয়াইন উপহার দেন। কিন্তু এই হার মানেই কি চেতনার রহস্যে বিজ্ঞানের পরাজয়? অনেক গবেষকের মতে, একেবারেই না। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ‘চেতনা’ গবেষণায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে এক অদ্ভুত প্রযুক্তি : ট্রান্সক্রেনিয়াল ফোকাসড আল্ট্রাসাউন্ড। নামটা ভারী, ধারণাটাও বৈপ্লবিক। মাথার খুলি ভেদ করে শব্দতরঙ্গ পাঠিয়ে, মস্তিষ্কের গভীর স্তরে নির্দিষ্ট এলাকাকে, মাত্র কয়েক মিলিমিটার পরিসরে উদ্দীপিত করা যায়। শুধু তাই নয়, সেই উদ্দীপনার ফলে কী পরিবর্তন হচ্ছে, সেটাও নজরে রাখা সম্ভব। MIT-এর দুই গবেষক সম্প্রতি নিউরোসায়েন্স এন্ড বায়োবিহেভেরিয়াল জার্নালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, কীভাবে এই প্রযুক্তি চেতনার কঠিন সমস্যাটিকে ধীরে ধীরে ভাঙতে পারে। তাঁদের যুক্তি পরিষ্কার, “এতদিন আমরা শুধু মস্তিষ্কের কার্যকলাপ দেখতে পেরেছি, বদলাতে পারিনি। ফলে যা পেয়েছি, তা কেবল সহসম্পর্ক- কারণ মাত্র, পরিণতি নয়। ফোকাসড আল্ট্রাসাউন্ড এক্ষেত্রে প্রথমবার সেই দেওয়ালই ভাঙতে পেরেছে।” গবেষক ড্যানিয়েল ফ্রিম্যান বলছেন, “এ এমন এক হাতিয়ার, যার মাধ্যমে সুস্থ মানুষের মস্তিষ্কের ভিতরের নির্দিষ্ট অংশে হস্তক্ষেপ করা যায়। যা আগে কল্পনাও করা যেত না।“ তাঁর মতে, এই প্রযুক্তি শুধু চিকিৎসা বা মৌলিক স্নায়ুবিজ্ঞানের জন্য নয়, চেতনার মতো গভীর দার্শনিক সমস্যাকেও পরীক্ষাগারে এনে দাঁড় করাতে পারে। ব্যথার অনুভূতি কোথা থেকে আসে? আমরা কীভাবে আলো দেখি? এমনকি চিন্তার মতো জটিল অভিজ্ঞতার উৎস কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা এবার আর নিছক অনুমান নয়। MRI, EEG, বা সাধারণ আল্ট্রাসাউন্ড সবই মূলত মস্তিষ্কের চলমান কার্যকলাপের ছবি তুলে ধরে, কিন্তু কিছু বদলাতে পারে না। অন্যদিকে, ট্রান্সক্রেনিয়াল চৌম্বক বা বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা থাকলেও সেগুলি বেশ ভোঁতা অস্ত্র। তারা বড় এলাকা জুড়ে প্রভাব ফেলে কিন্তু গভীরে পৌঁছোতে পারে না। অথচ চেতনা সংক্রান্ত অনেক তত্ত্বই বলছে, মস্তিষ্কের গভীর সাব-কর্টিকাল অংশগুলিই চেতনার আসল চাবিকাঠি। এই গভীর অংশে এতদিন হস্তক্ষেপ করার একমাত্র উপায় ছিল অস্ত্রোপচার – যা কিনা ঝুঁকিপূর্ণ, আক্রমণাত্মক, এবং নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। MIT-এর দার্শনিক ম্যাথিয়াস মিশেল সোজাসাপটা বলছেন, “নিরাপদ অথচ কার্যকরভাবে মস্তিষ্কের গভীর অংশে হস্তক্ষেপ করার উপায় প্রায় ছিলই না।“ ফোকাসড আল্ট্রাসাউন্ড সেই শূন্যতাই পূরণ করছে। ফ্রিম্যানের ভাষায়, “ইতিহাসে এই প্রথম, আমরা মাথার খুলি থেকে কয়েক সেন্টিমিটার গভীরতায় আবেগীয় বর্তনীগুলিকে অপারেশন ছাড়াই নাড়াচাড়া করতে পারছি।“ তাহলে চেতনা কি উচ্চস্তরের কোনো মানসিক প্রক্রিয়া? যুক্তি, আত্মচেতনা এসব কি বিভিন্ন অঞ্চলের সমন্বয় ছাড়াও করা সম্ভব? নাকি নির্দিষ্ট কিছু স্থানীয় নিউরাল প্যাটার্নই যথেষ্ট, বিশেষ করে মস্তিষ্কের পিছনের অংশে বা সাব-কর্টিকাল স্তরে? আসন্ন পরীক্ষাগুলিতে তাঁরা ভিজুয়াল কর্টেক্স ও ফ্রন্টাল কর্টেক্সে উদ্দীপনা দিয়ে দেখবেন, নিউরন সক্রিয় হওয়া আর সত্যিই “কিছু দেখা”- এই দুইয়ের ফারাক কোথায়। ফ্রিম্যানের কথায়, “নিউরন সাড়া দিল কি না, সেটা এক জিনিস। আর মানুষ আলো দেখল কি না, সেটা আরেক জিনিস।“ ফোকাসড আল্ট্রাসাউন্ড হয়তো রাতারাতি চেতনার রহস্য ভেদ করতে পারবে না। কিন্তু এতদিন যে অন্ধকার নিয়ে হাতড়ানো চলছিল, সেখানে অন্তত প্রথম আলোটা জ্বালাতে পারবে।

 

সূত্র: Nautilus Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 2 =