গবেষণার সততা নিশ্চিতকরণে চীন  

গবেষণার সততা নিশ্চিতকরণে চীন  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

বিজ্ঞান কেবল আবিষ্কারের প্রতিযোগিতা নয়; এ হল বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক নৈতিক চুক্তি। সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে শুধু যে কোনো প্রথিতযশা গবেষকের গবেষণার ক্ষতি হয় তাই নয় , ডুবে যায় গোটা দেশের একাডেমিক সুনাম। ঠিক এমনই এক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে চীনে। চীনা গবেষণা নিয়ে নৈতিকতার প্রশ্নে এবার সরাসরি জবাবদিহির মুখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। গবেষণায় গুরুতর অসদাচরণে জড়িত অধ্যাপক কিংবা গবেষকদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে প্রতিষ্ঠানগুলোকেই শাস্তি পেতে হবে, এমনই কড়া বার্তা দিয়েছে চীনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।

এই নীতিগত কড়াকড়ির এক দীর্ঘ প্রেক্ষাপট আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে বিপুলসংখ্যক প্রবন্ধ প্রত্যাহারের ঘটনায় চীনের নাম বারবার উঠে এসেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে প্রকাশনা সংস্থা Wiley–এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান Hindawi একসঙ্গে ৯,৬০০–এর বেশি প্রবন্ধ প্রত্যাহার করে, যার মধ্যে প্রায় ৮,২০০ প্রবন্ধে অন্তত একজন সহলেখক ছিলেন চীনা। সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়; এগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটা দেশের গবেষণা নিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।

MOST–এর সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক জার্নালে অসদাচরণের কারণে প্রত্যাহার হওয়া প্রবন্ধগুলোর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বচ্ছ এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালিয়ে ফলাফল প্রকাশ করতে হবে। দোষ প্রমাণিত হলে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ব্যক্তিকে নয়, প্রতিষ্ঠানকেও জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে যদি তারা অনিয়ম আড়াল করে বা প্রচ্ছন্ন সমর্থন জানায়। অবশ্য সম্ভাব্য শাস্তির ধরন নির্দিষ্ট করা হয়নি। তবে একটা কথা স্পষ্ট বোঝা গেছে, গোপনীয়তার আড়ালে আর কোনো সমঝোতা নয়। অর্থাৎ, নৈতিকতার প্রশ্নে আর কোনো ছাড় নয়।

এই পদক্ষেপের চিন্তা ভাবনা হঠাৎ করে আসেনি। ২০২৪ সালে চীন প্রথমবার জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যাহৃত প্রবন্ধগুলোর সমীক্ষা চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জানাতে বলা হয় কেন প্রবন্ধগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অনিয়মের তদন্ত কতদূর এগিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গুরুতর অসদাচরণের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করতে একটি জাতীয় ডেটাবেসও গড়ে তোলা হয়েছে। ভবিষ্যতে গবেষণা অনুদান, বড় প্রকল্প, গুণপণা–কর্মসূচি কিংবা একাডেমিক নির্বাচনে যোগ্যতা বিবেচনার সময় এই ডেটাবেসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে।

শাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়য়ে গবেষণাসংক্রান্ত নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লি ট্যাংয়ের মতে, একাডেমিক অসদাচরণ রোধে প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনা কার্যকর কৌশল হতে পারে। কারণ গবেষণার পরিবেশ, মূল্যায়ন–ব্যবস্থা এবং প্রণোদনার কাঠামো তৈরি করে প্রতিষ্ঠানই। সেখানে যদি নৈতিক মানদণ্ড কঠোর হয়, ব্যক্তিগত অনিয়মও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

মোটের ওপর এই পদক্ষেপকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও ক্রমবর্ধমান এক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। বিশ্বের বিজ্ঞানসমাজে আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে সংখ্যার চেয়ে বেশি দরকার স্বচ্ছতা ও সততা। চীন এখন সেই বার্তাই দিচ্ছে—গবেষণায় সাফল্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, তার ভিত্তি হতে হবে সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। উন্নতির দৌড়ে এগোতে হলে প্রথম শর্ত, গবেষণার ভিত হোক নির্ভেজাল সত্য।

 

সূত্র: China to punish universities that fail to sanction research misconduct By Mohana Basu, published in Nature journal, 11th February 2026. doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-00321-5

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + 7 =