গর্ভকালীন পুষ্টি ও সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য 

গর্ভকালীন পুষ্টি ও সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১০ জানুয়ারী, ২০২৬

একটি শিশুর ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য শুধুমাত্র জিনের দ্বারা নির্ধারিত নয়, বরং গর্ভাবস্থায় মায়ের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস সন্তানের অন্ত্রস্বাস্থ্য, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের স্থূলতা ও প্রদাহজনিত রোগের ঝুঁকিও নির্ধারণ করতে পারে। সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট পাস্তুর ও ইনসার্ম-এর গবেষকেরা দেখিয়েছেন, গর্ভাবস্থায় ও স্তন্যদানকালে মায়ের খাদ্যে থাকা কিছু সাধারণ খাদ্য-ইমালসিফায়ার সন্তানের অন্ত্রস্বাস্থ্যকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারে, যার ফল ভোগ করতে হয় বহু বছর পরে।

ইমালসিফায়ার এমন রাসায়নিক পদার্থ যা তেল ও জলের মতো তরল উপাদানকে মিশিয়ে রাখতে সাহায্য করে। আইসক্রিম, বেকারি পণ্য, সস, দুগ্ধজাত খাদ্য এবং বিশেষ করে গুঁড়ো দুধে এ ধরনের উপাদান ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। গবেষণায় দুটি সাধারণ ইমালসিফায়ার—কার্বক্সিমিথাইল সেলুলোজ (E466) এবং পলিসরবেট-৮০ (E433) ব্যবহার করা হয়। গবেষণাটি হয় মূলত ইঁদুরের ওপরে ।

গবেষকেরা দেখেন, যেসব মা-ইঁদুর গর্ভধারণের আগে ও পরে এই ইমালসিফায়ার গ্রহণ করেছিল, তাদের সন্তানদের অন্ত্রের জীবাণুসমষ্টি জীবনের প্রথম দিকেই অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তন পরবর্তীকালে স্বাভাবিক মনে হলেও, শরীরের ভেতরে তার প্রভাব দীর্ঘদিন রয়ে যায়।

বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়, কিছু ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রের প্রাচীরের খুব কাছে চলে আসে এবং ফ্লাজেলিন নামক এক ধরনের অণুর উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। এতে অন্ত্রের প্রতিরোধব্যবস্থা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে অন্ত্রে থাকা গবলেট কোষ দ্বারা তৈরি বিশেষ পথ—যা শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সহনশীলতা শেখাতে সাহায্য করে—তা অস্বাভাবিকভাবে আগেই বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে প্রতিরোধব্যবস্থা সঠিক প্রশিক্ষণ না পেয়ে প্রদাহপ্রবণ হয়ে ওঠে।

এই প্রাথমিক পরিবর্তনের ফল সুদূরপ্রসারী। প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় ওই ইঁদুরদের মধ্যে উচ্চ-চর্বিযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে সহজেই স্থূলতা দেখা যায়। কোলাইটিসের মতো অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। আশ্চর্যের বিষয়, শুধুমাত্র জন্মের পরের প্রথম দিকের অন্ত্রজীবাণুর পরিবেশই এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার জন্য যথেষ্ট ছিল।

যদিও গবেষণাটি ইঁদুরের ওপর করা, তবু বিজ্ঞানীরা মনে করছেন মানুষের ক্ষেত্রেও এটি গুরুতর সতর্কবার্তা। বিশেষ করে গর্ভাবস্থা ও নবজাতক পর্যায়ে খাদ্যে থাকা ইমালসিফায়ারের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতা রক্ষায় মায়ের খাদ্যাভ্যাস যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই গবেষণা তা আরও একবার জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।

 

সূত্র: Maternal emulsifier consumption alters the offspring early-life microbiota and goblet cell function leading to long-lasting diseases susceptibility by Clara Delaroque, Héloïse Rytter, et.al; published in the journal Nature Communications, 29th July,2025. Article number: 6954 (2025)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − six =