গাজর-বর্জ্য থেকে প্রোটিন !

গাজর-বর্জ্য থেকে প্রোটিন !

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ জানুয়ারী, ২০২৬

বর্তমানে বিশ্বের খাদ্যশিল্প এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে প্রতিদিন টনকে টন সবজির অবশিষ্টাংশ খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানাগুলো ফেলে দিচ্ছে, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ পর্যাপ্ত প্রোটিনের অভাবে ভুগছে। এই দ্বন্দ্বের মাঝেই আশার আলো দেখাচ্ছে এক অভিনব বৈজ্ঞানিক গবেষণা। এক্ষেত্রে গাজরের বর্জ্যকে রূপান্তরিত করা হচ্ছে উচ্চমানের, পরিবেশবান্ধব প্রোটিনে।

জার্মানির গবেষকেরা দেখিয়েছেন, গাজরের রস বা প্রাকৃতিক রং তৈরির পর যে অংশগুলো বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, সেগুলোই আসলে পুষ্টির অপার ভাণ্ডার। এতে রয়েছে শর্করা, খনিজ ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান, যা ভোজ্য ছত্রাকের আদর্শ খাদ্য। বিশেষ করে ছত্রাকের পুষ্টিশোষক তন্তুজাল—এরা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং অল্প জায়গায় উৎপাদনযোগ্য হওয়ায় এটি বড় পরিসরের খাদ্য উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

গবেষণায় ১০৬টি ভিন্ন ছত্রাক প্রজাতি নিয়ে পরীক্ষা করা হয় কমলা ও কালো গাজরের তরল বর্জ্যের ওপর। এর মধ্যে প্লুরোটাস জামোর বা গোলাপী ঝিনুক আকৃতির মাশরুম সবচেয়ে ভালো ফল দেয়। এই ছত্রাক দ্রুত একটানা বেড়ে ওঠে এবং উচ্চমাত্রার প্রোটিন উৎপাদন করে। উপযুক্ত অম্লতা ও শর্করার মাত্রা বজায় রেখে বিজ্ঞানসম্মতভাবে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এর প্রোটিনের মাত্রা ৩০ শতাংশেরও বেশি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে, যা অনেক প্রাণীজ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের সমতুল্য।

এই ছত্রাক প্রোটিন কেবল প্রোটিনেই সমৃদ্ধ নয়; এতে রয়েছে খাদ্যতন্তু, কম চর্বি এবং এদের কোষপ্রাচীরে রয়েছে গ্লুকান ও কাইটিনের মতো উপাদান, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে পরিচিত। যদিও কিছু অ্যামিনো অ্যাসিড এতে তুলনামূলকভাবে কম উপস্থিত, তবুও শস্যজাত খাবারের সঙ্গে মিলিয়ে খেলে পুষ্টির ভারসাম্য সহজেই পূরণ করা যায়।

গবেষণার বাস্তব প্রয়োগও আশাব্যঞ্জক। ফাঙ্গাল মাইসেলিয়াম দিয়ে তৈরি ভেগান প্যাটিস ও সসেজ স্বাদ পরীক্ষায় সয়াভিত্তিক বা ডালজাত বিকল্পের তুলনায় বেশি প্রশংসা পায়। এর গঠন ছিল নরম ও মাংসসদৃশ, তিক্ততা কম, আর স্বাদে স্পষ্ট উমামি। অর্থাৎ,যে স্বাদ টক, মিষ্টি, নোনতা ও তেতো-এর মতো পঞ্চম মৌলিক স্বাদ হিসেবে বিবেচিত হয়। এধরনের স্বাদ উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে সচরাচর দুর্লভ।

সবচেয়ে বড় কথা, এই পদ্ধতিতে নতুন জমি, অতিরিক্ত জল বা ভারী কার্বন নিঃসরণের প্রয়োজন নেই। খাদ্যবর্জ্যকে পুনর্ব্যবহার করে প্রোটিন উৎপাদনের ফলে পরিবেশগত চাপও কমে।

 

সূত্র: Pleurotus djamor Mycelium: Sustainable Production of a Promising Protein Source from Carrot Side Streams by Leonie Cora Juhrich, Iris Lammersdorf, et.al; published in the Journal of Agricultural and Food Chemistry, 17th Dcember,2025.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 − seven =