গাণিতিক প্রমাণের কাঠগড়ায় কৃ বু 

গাণিতিক প্রমাণের কাঠগড়ায় কৃ বু 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সত্যিই নতুন গণিত আবিষ্কার করতে পারে, নাকি সে কেবল পুরোনো জ্ঞানকে নতুন মোড়কে সাজিয়ে পরিবেশন করে? এই প্রশ্নকে আর তাত্ত্বিক বিতর্কের স্তরে আটকে রাখতে চান না গণিতবিদরা। তাই এই প্রশ্নকে সামনে রেখে এবার বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কিছু গণিতবিদ এ আই শিল্পের সামনে ছুড়ে দিয়েছেন সরাসরি এক কঠিন চ্যালেঞ্জ—”উত্তর দিলে, তার প্রমাণও দেখাও।“ অর্থাৎ, শুধু ফলাফল নয়, সম্পূর্ণ যুক্তিসংগত প্রমাণ হাজির করো।

এই উদ্যোগের নাম “First Proof”/প্রথম প্রমাণ পদ্ধতি। সাম্প্রতিক একটি প্রিপ্রিন্টে বর্ণিত এই প্রকল্পে বিশ্বের ১১ জন প্রখ্যাত গণিতবিদ,যাদের মধ্যে একজন ফিল্ডস মেডেলজয়ীও আছেন, এই চ্যালেঞ্জটি দিয়েছেন। এরা নিজেদের চলমান গবেষণা থেকে উঠে আসা, সম্পূর্ণ নতুন কিছু সমস্যাকে একটি পরীক্ষার রূপ দিয়েছেন। এগুলো কোনো পাঠ্যবই বা পরিচিত প্রতিযোগিতার প্রশ্ন নয়; এগুলো এমন সমস্যা, যা এখনো গণিতের ইতিহাসে প্রকাশই পায়নি। এ আই সিস্টেমগুলোকে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে।

এই পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর স্বচ্ছতা। সমস্যাগুলোর সঠিক সমাধান আগে থেকেই তৈরি করে রাখা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো এনক্রিপ্ট করাই হল কাজ। নির্দিষ্ট সময়ে সেই প্রমাণ প্রকাশিত হবে, যাতে এ আই–এর দেওয়া সমাধানগুলো প্রকৃতপক্ষে সঠিক কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা যায়।

MIT–এর গণিতবিদ অ্যান্ড্রু সাদারল্যান্ডের মতে,এ আই–এর গাণিতিক দক্ষতা যাচাই করার ক্ষেত্রে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য পরীক্ষা। কারণ আগের সাফল্যগুলো যেমন- গুগলের Gemini Deep Think ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণমানের স্কোর করা বা কিছু বিখ্যাত সমস্যার সমাধান , গবেষণামূলক গণিতের প্রকৃত মানদণ্ডে পড়ে না। কারণ অলিম্পিয়াড সমস্যাগুলো গবেষণাভিত্তিক নয়, আর অনেক সময় এ আই পুরোনো ও বিস্মৃত প্রমাণ খুঁজে এনে সেগুলোকে নতুন বলে উপস্থাপন করে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে একটি এ আই–এর প্রমাণ পরে লেখাপত্র থেকে ভুলভাবে উপস্থাপিত অনুসন্ধান বলেও চিহ্নিত হয়েছে।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল স্পিলম্যান আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, এ আই–ভিত্তিক গাণিতিক গবেষণার অনেক প্রতিবেদনই আসে সেইসব প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে যারা নিজেরাই সেই মডেল তৈরি করছে। বিষয়টা অনেকটা বিজ্ঞাপনের মতোই । ফলে নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তো থেকেই যায়।

“First Proof” এই অস্পষ্টতার জটটাই কাটাতে চায়। এখানে সমস্যাগুলোর সমাধান আগে থেকেই লেখা আছে, কিন্তু সেগুলো এনক্রিপ্ট করা। নির্দিষ্ট সময়ে সেগুলো প্রকাশিত হবে। যাতে বোঝা যায় এ আই–এর উত্তরগুলো কতটা সঠিক ও মৌলিক।

এখানে দেওয়া সমস্যাগুলো বিরাট কোনো যুগান্তকারী উপপাদ্য নয়; এগুলো মূলত “লেমা”। গণিত/কম্পিউটার বিজ্ঞানে , “লেমা” বলতে অগণিত ক্ষুদ্র “সহায়ক উপপাদ্য”কে বোঝায় যা একটি বৃহত্তর বিবৃতি প্রমাণ করতে ব্যবহৃত হয়। বা, বলা যায় বড় তত্ত্ব প্রমাণের পথে প্রয়োজনীয় ছোট কিন্তু অপরিহার্য ধাপ।

গণিতবিদদের আশা, এ আই যদি এই স্তরে নির্ভুল ও স্বচ্ছভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে সেটিই হবে তার সবচেয়ে বাস্তব ও মূল্যবান অবদান। কারণ, এ আই –এর ভবিষ্যৎ প্রভাব হয়তো গবেষণার দৈনন্দিন শ্রমসাধ্য কাজগুলোকে দ্রুত ও সহজ করে দিতে পারবে। সাদারল্যান্ড বলেন, কৃবুর সবচেয়ে বড় প্রভাব হবে বড় সমস্যার সমাধানে নয়, বরং গণিতবিদদের প্রতিদিনের কাজে সহকারী হিসেবে ঢুকে পড়ায়। অনেকের মতে, ২০২৬ সালই হতে চলেছে সেই মোড় ঘোরানো সময়, যখন গণিত জগৎ এ আই–কে নতুন চোখে দেখতে শুরু করবে।

 

সূত্র: Mathematicians issue a major challenge to AI: Show us your work By JOSEPH HOWLETT Edited By CLAIRE CAMERON, SCIAM, 9th February 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × 1 =