গ্রিনল্যান্ডে বিজ্ঞানের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ

গ্রিনল্যান্ডে বিজ্ঞানের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ মার্চ, ২০২৫

তুষারাবৃত গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অন্তর্ভুক্ত একটি স্বশাসিত অঞ্চল। গ্রিনল্যান্ড বহুদেশের বহু সুমেরু-বিজ্ঞানীর কাছে বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি আন্তর্জাতিক কর্মচঞ্চল কেন্দ্র, বিশেষ করে পরিবেশ গবেষণার জন্য। প্রত্যেক গ্রীষ্মে নানা দেশের বিজ্ঞানীরা গ্রিনল্যান্ড চষে ফেলে পরিমাপ করেন সুমেরুর বরফ কতটা গলল এবং তার ফলে দুনিয়া জুড়ে সমুদ্রের উপরিপৃষ্ঠ কতটা উঁচু হল। সম্প্রতি নির্বাচনের পর গ্রিনল্যান্ড সরকার তাদের স্বশাসিত অঞ্চলের গবেষণা-ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নতুন করে উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। ২০ মার্চ গ্রিনল্যান্ড সরকারের এক প্রতিনিধি সুমেরু অধিবেশনকে জানান, তাঁরা গবেষণা সংক্রান্ত আইনকানুন এবং জাতীয় নীতি-নির্দেশিকা প্রণয়ন করার কাজে নেমেছেন। এর কাজ হবে বিশ্বের বিজ্ঞানীরা যাতে গ্রিনল্যান্ডের উৎসাহী ব্যক্তিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গবেষণা উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারেন সে-কাজে পরামর্শ দেওয়া। কিন্তু ইদানীং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে সেই গবেষণায় ব্যাঘাত ঘটছে। কারণ ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেই হোক, কিংবা টাকার জোরেই হোক, গ্রিনল্যান্ড “নিয়ে নেবেন”। কারণ ওখানে আছে দুর্লভ সব আকরিক। মার্কিন উপ-রাষ্ট্রপতি জে ডি ভ্যান্স কয়েক দিনের মধ্যে গ্রিনল্যান্ডে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পরিদর্শনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। প্রতিবাদে, তাঁর সফরের ঠিক আগে আমেরিকার কলোরাডোয় অনুষ্ঠিত সুমেরু বিজ্ঞান শীর্ষ সম্মেলনের ‘গ্রিনল্যান্ড গবেষণা অধিবেশন’ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। ২৬ মার্চ অধিবেশন ভবনের সামনে পঞ্চাশ জনেরও বেশি বিজ্ঞানী গ্রিনল্যান্ডের লাল-সাদা পতাকা হাতে ভবনটিকে বৃত্তাকারে ঘিরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। নরওয়ের বের্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী কেরিম হেস্টেনেস নিসান্সিওগ্লু গ্রিনল্যান্ডের স্বশাসনের অধিকারের সপক্ষে এই সংহতি প্রদর্শনের উদ্যোক্তা। তিনি বলেছেন, “গ্রিনল্যান্ডে আমাদের বন্ধু ও সহ-বিজ্ঞানীদের প্রতি আমাদের সমর্থন প্রদর্শন করতে চাই আমরা, বিশেষ করে আজকে যখন তাঁরা অত্যন্ত চাপের মধ্যে আছেন।” ট্রাম্পের এই অবস্থান এমনকি মার্কিন বিজ্ঞানীদেরও ক্ষুব্ধ ও চিন্তাগ্রস্ত করেছে। ঝামেলার আশঙ্কায় নাম জানাতে অনিচ্ছুক এক মার্কিন বিজ্ঞানী ট্রাম্পের এইসব কাজকে “আপত্তিকর এবং অশোভন” বলে অভিহিত করে বলেছেন, “এগুলির প্রভাব একেবারে সর্বনাশা হয়েছে”। কোনো কোনো মার্কিন গবেষক এই পরিস্থিতিতে গ্রিনল্যান্ডে গিয়ে কাজ করতে “অপ্রস্তুত বোধ” করছেন, অথচ এতদিন গ্রিনল্যান্ডবাসীদের সঙ্গে তাঁদের হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। এর আগেই গ্রিনল্যান্ডের স্ব-শাসনের অধিকারকে সমর্থন করে ফেব্রুয়ারি মাসে আড়াইশো জন মার্কিন বিজ্ঞানী এবং কয়েক ডজন আন্তর্জাতিক গবেষক, বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে স্বাক্ষরিত একটি যৌথ বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন, “এলাকা দখল না করে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ করলে শেষ পর্যন্ত সেটা তো গ্রিনল্যান্ড আর আমেরিকা উভয় দেশের মানুষেরই কাজে লাগবে। কেননা এর ফলে পরিবর্তনশীল সুমেরু অঞ্চল সম্পর্কে আমাদের যৌথ জ্ঞান বাড়বে, আর স্থানীয় স্তর থেকে বিশ্বস্তরে সমস্যা সামাল দেওয়ার কাজেও সহায়তা করা সম্ভব হবে”। নিসান্সিওগ্লু বলেছেন, “কিন্তু বলাই বাহুল্য, এই পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানও রাজনীতির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে – এটা বড়োই পরিতাপের বিষয়”।

One thought on “গ্রিনল্যান্ডে বিজ্ঞানের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ

  1. প্রবীর মুখোপাধ্যায়

    চিন্তজনক খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen − 4 =