দিনের শুরু হোক কিংবা অলস বিকেলের ক্লান্তি ভাঙানো—চা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। কিন্তু এই পরিচিত পানীয়টি যে কেবল স্বাদ বা অভ্যাসের বিষয় নয়, বরং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও সহায়ক —এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা। বহু সংস্কৃতিতে এটি ঐতিহ্যবাহী ভেষজ চিকিৎসার অংশ হিসেবেও বিবেচিত। বেভারেজ প্ল্যান্ট রিসার্চ জার্নালে প্রকাশিত একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা জানাচ্ছে, নিয়মিত ও পরিমিত চা পান হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার এবং এমনকি বার্ধক্যজনিত শারীরিক ও মানসিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
মানবদেহে চায়ের সবচেয়ে সুস্পষ্ট প্রভাব দেখা যায় হৃদ্যন্ত্র ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে। একাধিক দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যাভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত চা পানকারীদের মধ্যে হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম। বিশেষ করে গ্রিন টি রক্তচাপ ও ক্ষতিকর LDL কোলেস্টেরল কমাতে সহায়তা করে। গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, দিনে প্রায় ১.৫ থেকে ৩ কাপ চা পান করলে হৃদ্রোগজনিত ঝুঁকি হ্রাস পেতে পারে, আর সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর মাত্রা প্রায় ২ কাপ।
চায়ের উপকারিতা কিন্তু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেও গ্রিন টির ভূমিকা আশাব্যঞ্জক। কিছু ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট সময় ধরে গ্রিন টি বা এর ক্যাটেচিন গ্রহণ শরীরের চর্বি কমাতে, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস করতে এবং বিপাকীয় সূচক উন্নত করতে পারে। বিশেষত যাদের ওজন বেশি তাদের ক্ষেত্রে।
ক্যানসারের ক্ষেত্রে গবেষণার ফলাফল তুলনামূলকভাবে মিশ্র হলেও, কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমার ইঙ্গিত মিলেছে। মুখগহ্বর, ফুসফুস (বিশেষ করে নারীদের মধ্যে) এবং কোলন ক্যানসারের ক্ষেত্রে নিয়মিত গ্রিন টি পান অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে একাধিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
চা মস্তিষ্ক ও বার্ধক্যজনিত সমস্যার ক্ষেত্রেও সম্ভাবনাময়। পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা যায়, নিয়মিত চা পানকারীদের মধ্যে স্মৃতিভ্রংশ ও বোধবুদ্ধির দুর্বলতার হার কম। চায়ে থাকা থিয়ানিন নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড মানসিক চাপ কমাতে ও মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক বলে ধারণা করা হয়। পাশাপাশি, কিছু প্রাথমিক গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে যে বার্ধক্যজনিত পেশি ক্ষয় (সারকোপেনিয়া) প্রতিরোধেও চায়ের পরিবেশনের ভূমিকা থাকতে পারে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করছেন—সব চা সমান নয়। বোতলজাত বা বাবল টি-তে থাকা অতিরিক্ত চিনি, কৃত্রিম মিষ্টি ও সংরক্ষণকারী উপাদান চায়ের উপকারিতা অনেকটাই নষ্ট করে দেয়। এছাড়া এই প্রক্রিয়াজাত চা দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত পান করলে দূষণকারী পদার্থ বা পুষ্টি শোষণে বাধা প্রভৃতি বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে।
পরিমিত পরিমাণে, তাজা ও প্রথাগতভাবে প্রস্তুত চা হতে পারে আধুনিক জীবনের এক সহজ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর স্বাস্থ্যসঙ্গী। তবে এর প্রকৃত উপকার পেতে হলে প্রক্রিয়াজাত চা নয়, বরং প্রাকৃতিক স্বাভাবিক চা বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সূত্র: “Beneficial health effects and possible health concerns of tea consumption: a review” by Mingchuan Yang, Li Zhou,et.al;13th November 2025, Beverage Plant Research.
DOI: 10.48130/bpr-0025-0036
