ছত্রাকের কেরামতিতে পরিত্যক্ত গদির নবরূপ

ছত্রাকের কেরামতিতে পরিত্যক্ত গদির নবরূপ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ৫০,০০০ পুরোনো গদি (ম্যাট্রেস) আবর্জনা হিসেবে বর্জ্যস্তূপে ফেলে দেওয়া হয়। অথচ একটি গদির প্রায় ৭৫ শতাংশ উপাদান পুনর্ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর বড় অংশই শেষ পর্যন্ত ভাগাড়ে গিয়ে জমা হয়। সেখানে সেগুলো পচতে ১২০ বছর পর্যন্ত সময় নিয়ে নেয়। বিশাল আকার, জটিল স্তরবিন্যাস এবং পরিবহন–ব্যয়ের কারণে এগুলোর পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করা কঠিন। এই সমস্যার পরিসর এত বড় যে এ নিয়ে কাজ করার জন্য আমেরিকায় গঠিত হয়েছে ‘গদি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ পরিষদ’। এধরণের ক্রমবর্ধমান সমস্যার নতুন বৈজ্ঞানিক সমাধানের প্রয়োজন অনস্বীকার্য।

এই প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির গবেষকেরা এক অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। তাঁদের এই গবেষণার বিবরণ সম্প্রতি সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে-এ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁরা দেখিয়েছেন, পরিত্যক্ত গদির পলিইউরেথেন ফোমকে জৈবপ্রযুক্তির সহায়তায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরিবেশবন্ধব তাপ-নিরোধক উপাদানে রূপান্তর করা সম্ভব। এই রূপান্তরের নেপথ্যে রয়েছে এক অণুজীব— পেনিসিলিয়াম ক্রিসোজেনাম। এটি যে -ছত্রাকগোষ্ঠীর সদস্য, তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় প্রজাতি হল পেনিসিলিয়াম রুবেনস। এ থেকে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করেছিলেন। যদিও এখানে ব্যবহৃত প্রজাতিটি আলাদা, তবুও এর জৈবিক বৈশিষ্ট্য পরিবেশবান্ধব উপাদান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

গবেষকেরা প্রথমে ফেলে দেওয়া গদি থেকে সংগৃহীত পলিইউরেথেন ফোমকে ছোট ছোট টুকরো করে নেন। এরপর তাতে ছত্রাকের বীজাণু মিশিয়ে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষ করা হয়। ছত্রাক বেড়ে ওঠার সময় ফোমের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে এর সূক্ষ্ম শিকড়–সদৃশ মাইসেলিয়াম প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট জমিয়ে রাখে। এই খনিজ উপাদানটি ফোমের সঙ্গে মিলিত হয়ে তৈরি করে একপ্রকার হালকা ধরনের দৃঢ় মিশ্র জৈব যৌগ। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই নতুন উপাদানটির চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো এর তাপ–সহনশীলতা। এটি প্রায় ১,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে সক্ষম, যা অগ্নি–নিরোধক নির্মাণসামগ্রীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। তাপ নিরোধক ক্ষমতার দিক থেকেও এটি বাজারে প্রচলিত বাণিজ্যিক অন্তরকের সমতুল্য। অর্থাৎ, এটি ঘরবাড়ি ও বহুতলের জন্য কার্যকর অগ্নি নিরোধক হিসেবে ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।

গবেষকদের মতে, আরও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে এই উপাদানের সাহায্যে ভবিষ্যতে অগ্নি–প্রতিরোধী প্যানেল, নির্মাণ–বোর্ড এবং এমনকি ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ–ভিত্তিক স্থাপত্য উপাদান তৈরি করা যেতে পারে। এই উদ্ভাবন কেবল একটি পুনর্ব্যবহার কৌশল নয়; এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। জীববিজ্ঞান ও বর্জ্য উপাদানকে একত্রে ব্যবহার করে টেকসই উৎপাদন প্রযুক্তির এক ঝলক এই গবেষণা। দেখা গেল পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর আবর্জনাকেও কীভাবে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তর করা যায়। যা ছিল পরিবেশের বোঝা, সঠিক বৈজ্ঞানিক হস্তক্ষেপে সেটিই হয়ে উঠবে ভবিষ্যতের সবুজ নির্মাণ–অবকাঠামোর ভিত্তি।

 

সূত্র: Fungi help turn old mattresses into insulation by Andrew Paul,

Published in scientific raport journal, 4th February, 2026 4:28 PM EST, popular science journal.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten − one =