জন্মশতবর্ষে আব্দুস সালাম

জন্মশতবর্ষে আব্দুস সালাম

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

নোবেলজয়ী পদার্থবিদ আব্দুস সালাম–এর জন্মশতবর্ষ আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। এটি কেবল একজন মহান বিজ্ঞানীর জন্মদিন স্মরণ নয়; বরং আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অসাধারণ মেধা, স্বপ্ন ও মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

১৯২৬ সালের ২৯শে জানুয়ারি, তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের ঝাং মাঘিয়ানায় জন্মগ্রহণ করেন আব্দুস সালাম। অল্প বয়সেই তাঁর অসাধারণ মেধার প্রকাশ ঘটে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ম্যাট্রিকুলেশন (আজকে যাকে আমরা মাধ্যমিক পরীক্ষা বলি) পরীক্ষায় তিনি ইতিহাসের সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেন, যা তাঁকে সমগ্র অঞ্চলে পরিচিত করে তোলে। এই সাফল্যই ভবিষ্যতে তাঁর বৈজ্ঞানিক জীবনের দৃঢ় ভিত্তি গড়ে দেয়।

১৯৪৯ সালে সালাম কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে দ্বৈত স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য বৃত্তি লাভ করেন। সেখানে তাঁর প্রতিভা দ্রুত স্বীকৃত হয় এবং ১৯৫০ সালে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাপূর্ণ “স্মিথস পুরষ্কার” অর্জন করেন, যা প্রাক-ডক্টরাল পর্যায়ে অসাধারণ গবেষণার জন্য প্রদান করা হয়। পরবর্তীকালে তিনি ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন ও ইতালির ত্রিয়েস্তেতে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স (আই সি টি পি)-এ কর্মরত ছিলেন।

আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে উঠেছে চারটি মৌলিক বলের ধারণার উপর। এর মধ্যে তড়িৎচুম্বকীয় বল ও দুর্বল নিউক্লিয়ার বলকে একীভূত করার যে যুগান্তকারী তত্ত্ব “ইলেক্ট্রোউইক ইউনিফিকেশন” , তার অন্যতম প্রধান স্থপতি ছিলেন আব্দুস সালাম। ১৯৬৮ সালে শেলডন গ্লাশো ও স্টিভেন ওয়াইনবার্গের সঙ্গে তিনি এই তত্ত্ব প্রস্তাব করেন, যা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল “দুর্বল চার্জহীন প্রবাহের” অস্তিত্ব। পরবর্তীতে পরীক্ষায় এর সত্যতা প্রমাণিত হয়। তত্ত্ব ও বাস্তবতার এ এক অসাধারণ সাযুজ্য।

এই ঐতিহাসিক অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে তাঁরা যৌথভাবে লাভ করেন নোবেল পুরস্কার (পদার্থবিজ্ঞান)। তবে সালামের অবদান এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। পতি–সালাম মডেল, গ্র্যান্ড ইউনিফাইড থিওরি, সুপারসিমেট্রি—এসব ক্ষেত্রেও তাঁর চিন্তাভাবনা আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে গভীর ছাপ রেখে গেছে।

বিজ্ঞান গবেষণার পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশের বিজ্ঞানীদের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স (আই সি টি পি)। সুযোগের অভাবে যাতে বিজ্ঞান গবেষণা বাধাপ্রাপ্ত না হয়, এই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

আব্দুস সালামের বৈজ্ঞানিক দর্শন তাঁর কথায় প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, “আমরা যত গভীরে অনুসন্ধান করি, ততই আমাদের বিস্ময়ের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।“ জন্মশতবর্ষে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু এক নোবেলজয়ীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং জ্ঞান, মানবিকতা ও বৈশ্বিক দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তকে সম্মান জানানো।

 

সূত্র: Mathematics Learning

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × one =