জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী যারা

জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী যারা

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬

২০২৪ সালের জলবায়ু সংকটের হিসাবনিকাশ যেন হঠাৎ করেই আমাদের এক অস্বস্তিকর নগ্ন সত্যের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। পৃথিবীর মোট কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণের অর্ধেকের জন্য দায়ী, মাত্র ৩২টি জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানি। গত বছর এই সংখ্যাটা ছিল ৩৬। মানে, সমস্যা ক্রমেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের আগুনে ঘি ঢালছে ক্রমশ ছোট হয়ে আসা, ক্ষমতাশালী কর্পোরেট গোষ্ঠী। ‘কার্বন মেজরস’ রিপোর্ট বলছে, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ‘সৌদি আরামকো’ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় দূষণকারী কোম্পানি। বিনিয়োগকারীদের মালিকানাধীন সংস্থার মধ্যে শীর্ষে এক্সনমোবিল। সমালোচকদের ভাষায়, এরা শুধু “জলবায়ু পদক্ষেপে বাধা” নয়, এরা ইতিহাসের ভুল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে রিপোর্টটি আরো দেখাচ্ছে, নিঃসরণ সংক্রান্ত তথ্য এখন ক্রমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠছে। এর সাহায্যেই কোম্পানিগুলিকে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যটি লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রের ভূমিকায়। বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দূষণকারীর মধ্যে ১৭টিই রাষ্ট্রায়ত্ত জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদক। অর্থাৎ, জলবায়ু সংকট আর শুধু কর্পোরেট লোভের গল্প নয়, এটি গভীরভাবে রাজনৈতিক এক প্রক্রিয়া। এই ১৭টি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ যেসব দেশের হাতে, তাদের মধ্যে আছে সৌদি আরব, রাশিয়া, চিন, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও ভারত। এরা সকলেই গত ডিসেম্বরে Cop30 জলবায়ু সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল। অথচ বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ সেই প্রস্তাবকেই সমর্থন জানায়। সংখ্যাগুলো শিউরে ওঠার মতো। শুধু সৌদি আরামকোই ২০২৪ সালে ১.৭ বিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ করেছে। এর বড় অংশই এসেছে রপ্তানিকৃত তেল থেকে। আরামকো বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম কার্বন দূষণকারী। রাশিয়ার ঠিক পরেই। এক্সনমোবিলের নিঃসরণ ৬১০ মিলিয়ন টন।
কোভিড মহামারির সময় কার্বন নিঃসরণের সাময়িক পতনের পর, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর গতি আবারও পুরোদমে ফিরেছে। প্রতি বছরই নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। প্যারিস চুক্তির ‘১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্য’ পূরণ করতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে নিঃসরণ কমাতে হবে ৪৫ শতাংশ। যা এখন কার্যত ‘অসম্ভব’ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবু তারা সতর্ক করছেন, সীমা যত বেশি পেরোবে, প্রতিটি দশমিক ডিগ্রিই তত বেশি ধ্বংস ডেকে আনবে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য। ইনফ্লুয়েন্স ম্যাপ থিঙ্কট্যাঙ্কের এমেট কনেয়ার বলছেন, “প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী নিঃসরণ ক্রমশ একটি ছোট কিন্তু উচ্চ-নিঃসরণকারী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। অথচ সামগ্রিক উৎপাদনও বেড়েই চলেছে।“ এই কেন্দ্রীকরণের পেছনে রয়েছে তেল শিল্পের সাম্প্রতিক মেগা-মার্জার। যেমন, এক্সনমোবিলের পাইওনিয়ার ন্যাচারাল রিসোর্স অধিগ্রহণ বা শেভরনের হেজ কেনা। ‘ফসিল ফুয়েল নন প্রলিফিরেশন ট্রিটি ইনিশিয়েটিভ’-এর টজেপোরা বারম্যান আরও সরাসরি ভাষায় বলেন, “এই বিশ্লেষণ আবারও দেখিয়ে দিল, একটি শক্তিশালী কর্পোরেট চক্র শুধু যে বিশ্ব নিঃসরণ দখল করে রেখেছে তাই নয়, তারা সক্রিয়ভাবে জলবায়ু বাঁচানোর পদক্ষেপকে নস্যাৎ করছে।”তাঁর মতে, এপ্রিল মাসে কলম্বিয়ায় ৮০টি দেশের বৈঠক ছিল জীবাশ্ম জ্বালানি সম্প্রসারণ থামিয়ে ন্যায়সঙ্গত রূপান্তরের পথে এগোনোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রাক্তন জাতিসংঘ জলবায়ু প্রধান ক্রিস্টিয়ানা ফিগুয়েরেস মনে করিয়ে দেন, “পরিষ্কার জ্বালানি ও বিদ্যুতায়নে এখন প্রায় দ্বিগুণ বিনিয়োগ হচ্ছে। তবু কার্বন মেজররা পুরনো, দূষণকারী পণ্যে আঁকড়ে আছে।“ তবে তিনি আশাবাদী।
কার্বন মেজরস-এর তথ্য ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর নিঃসরণ সরাসরি যুক্ত ডজনেরও বেশি মারাত্মক তাপপ্রবাহের সঙ্গে। ওই নিঃসরণ না হলে কার্যত এমনটা ঘটতই না। ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতির দায়ও আলাদা আলাদা কোম্পানির ঘাড়ে চাপানো সম্ভব হয়েছে। এই তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে জার্মানির ঐতিহাসিক মামলা লিউয়া বনাম আর ডবলু ই থেকে শুরু করে নিউ ইয়র্ক ও ভারমন্টের ‘ক্লাইমেট সুপারফান্ড’ আইনে। যাতে দূষণকারীদের জলবায়ু সুরক্ষার খরচ বহনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশানাল এনভায়রনমেন্টাল ল’-এর প্রধান রেবেকা ব্রাউন সোজাসাপটা বলেছেন, “প্রমাণ পাহাড়সম হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আদালত থেকে শুরু করে জাতীয় আদালত, সবাই এখন জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন আর জলবায়ু ধ্বংসের যোগসূত্র স্পষ্টভাবে দেখছে। সত্য যখন পরিষ্কার, আইন যখন স্পষ্ট, তখন জবাবদিহি আসবেই।“ এই প্রতিবেদন নিয়ে সৌদি আরামকো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে। এক্সনমোবিল কোনও জবাব দেয়নি। কিন্তু নীরবতাই হয়তো এখন তাদের সবচেয়ে জোরালো স্বীকারোক্তি।

সূত্র: Half of world’s CO2 emissions come from just 32 fossil fuel firms, study shows; The Guardian.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven − 4 =