
জুরাসিক পার্ক সিনেমার পরবর্তী পর্যায় হল ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড ডোমিনিয়ন’। এর সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তগুলির মধ্যে একটি হল যখন কোয়েটজালকোটলাস আকাশ থেকে নেমে এসে বীরদের বিমান আক্রমণ করে। এর বিশাল ডানাগুলি পুরোপুরি ছড়ালে ১০ মিটার দৈর্ঘ্যে পৌঁছায়। কোয়েটজালকোটলাস (Quetzalcoatlus ) হল জুরাসিক যুগে বিদ্যমান সর্ববৃহৎ টেরোসর। কিন্তু জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখিয়েছেন, জুরাসিক ওয়ার্ল্ড ডোমিনিয়ন সিনেমায় ভুল দেখানো হয়েছে। আসলে, এই দৈত্যাকার প্রাণীগুলি অল্প পাল্লার বেশি উড়তে পারত না। তাঁরা এর বায়ুগতির বিশ্লেষণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এই আশ্চর্যজনক আবিষ্কারের জন্য, ইউসুকে গোতো এবং নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অফ এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজের কেন ইয়োদা-র সমন্বয়ে গঠিত দলটি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ফ্রান্সের সিইবিসি-র সঝযোগিতায় এই বিলুপ্ত দৈত্যাকার উড়ন্ত প্রাণীর ক্ষমতা গণনা ও তুলনা করে। আধুনিক পাখি হিসেব করে শক্তি খরচ করে শক্তি-দক্ষ (energy-efficient) উপায়ে বায়ু এবং বায়ুস্রোত ব্যবহার করে উড়তে পারে। উড়ান দুই ধরনের হয় : তাপীয় উড়ান এবং গতিশীল উড়ান। তাপীয় উড়ান হল ফ্রিগেটবার্ড কিংবা ঈগলদের উড়ান। এরা উপরে উঠবার জন্য এবং পিছলে পিছলে যাওয়ার জন্য নিচ থেকে ঊর্ধ্বমুখী বায়ুস্রোতের ঠেলাকে (আপড্রাফ্ট) ব্যবহার করে। আর গতিশীল উড়ান সমুদ্রের উপর বায়ুর ঢালকে (গ্রেডিয়েন্ট) ব্যবহার করে, যেমন অ্যালবাট্রস এবং পেট্রেল পাখি। তাপীয় উড়ানে মাটি থেকে আকাশে উঠে-আসা উষ্ণ বাতাসের ক্রমবর্ধমান স্তম্ভগুলির মধ্য দিয়ে পাখিরা একটি সর্পিল বৃত্তাকার পথে উড়ে উড়ে বায়ু স্রোতে ভেসে চলতে সক্ষম হয়। এই প্রক্রিয়াটিতে খুব কম শক্তি ব্যয় করে তারা অনেক উচ্চতায় আরোহণ করতে সক্ষম হয়। আর গতিশীল উড়ানের কৌশলটি পাখিরা ব্যবহার করে বিভিন্ন বেগের সাথে বায়ু ভরের মধ্যে সীমানা অতিক্রম করে শক্তি অর্জন করতে । শুধু পাখিরা নয়, রেডিও-নিয়ন্ত্রিত গ্লাইডারেও এই কৌশলটি ব্যবহৃত হয়। এটি সবচেয়ে কার্যকর হয় বাধাপ্রাপ্ত জায়গার কাছাকাছি বা মাটির কাছাকাছি ।
এইবার আসা যাক মূল প্রসঙ্গে। একটি মডেল ব্যবহার করে, গবেষক দলটি বিলুপ্ত উড়ন্ত দৈত্যাকার প্রাণীটির চারটি প্রজাতির জন্য তাপীয় এবং গতিশীল উড়ানের কার্যকারিতা গণনা করেছেন এবং বর্তমানের পাখিদের কর্মক্ষমতার সাথে তার তুলনা করেছেন। তাঁরা দেখতে পেলেন, জুরাসিক পার্ক III-এ দেখানো বিখ্যাত টেরানোডন (Pteranodon ) ছিল সমুদ্রের উপর দিয়ে ঊর্ধমুখী বায়ুর ঠেলা (আপড্রাফ্ট) ব্যবহার করে উড়ানে পারদর্শী । আধুনিক ফ্রিগেটবার্ডের ওড়ার প্রক্রিয়া ঠিক এরকমই। কিন্তু যখন তাঁরা Quetzalcoatlus নামক এখন পর্যন্ত বসবাস-করা সবচেয়ে বড়ো উড়ন্ত প্রাণীটিকে নিয়ে গবেষণা করলেন, তাঁরা দেখলেন, বায়ুমণ্ডলীয় ঘনত্বের পরামিতিগুলি (প্যারামিটার) পরিবর্তন করা হলে প্রাণীটি উড়ানের উপযুক্ত নয়। গবেষকরা বলছেন, “কোয়েটজালকোটলাসের বিশাল দেহের সাথে যুক্ত বড়ো বড়ো ডানার ভার এত বেশি যে তাদের তাপীয় উড়ান দুর্বল হয়ে পড়ে, ঢালও হয়ে ওঠে খাড়া”। গবেষকদের মতে, বাতাসের যে-অবস্থার অধীনে সেটি দক্ষ তাপীয় উড়ান পরিচালনা করতে পারত সেরকম অবস্থা ছিল না, ছিল প্রতিকূল অবস্থা । আগে তাকে তাপীয় উড়ানে দক্ষ ভাবা হয়েছিল, সে নাকি মাটি স্পর্শ না করে ১০,০০০ মাইল অতিক্রম করতে সক্ষম। কিন্তু এই গবেষকদলের গবেষণা দেখাল যে এটির তাপীয় উচ্চতার ক্ষমতা ছিল আধুনিক পাখির মতো – যারা স্বল্প পাল্লায় ওড়ে । অনেকটা অনুরূপ আকারের টেরোস্যরাস (pterosaurs) বা কোরি বাস্টার্ড (Kori bustard) পাখি ঠিক তাই করে। এরা বেশিরভাগ সময় জমিতেই কাটায়। টেরোসরের পাশাপাশি, গবেষক দলটি দুটি বিলুপ্তপ্রায় দৈত্যাকার পাখির দিকেও নজর দিয়েছিল। একটি হল আর্জেনটাভিস ম্যাগনিফিসেন্স (Argentavis magnificens ), যা কিনা এখনো পর্যন্ত বিদ্যমান সবচেয়ে ভারী উড়ন্ত পাখি। দ্বিতীয়টি হল পেলাগোর্নিস সান্দের্সি ( Pelagornis sandersi , যার ডানা যে কোনো উড়ন্ত পাখির মধ্যে সবচেয়ে বড়ো)। এখানেও, দলটি একটি আশ্চর্যজনক বিষয় আবিষ্কার করেছে। একদিকে, তাদের ফলাফল পূর্ববর্তী গবেষণার সাথে একমত যে আর্জেন্টাভিস তাপীয় বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত ছিল । অন্যদিকে, তাঁরা দেখতে পেলেন যে পেলাগোর্নিস -ও তাপীয় উড়ানের জন্য উপযুক্ত, যদিও আগে ভাবা হয়েছিল এটি গতিশীল উড়ান ব্যবহার করে। যদিও জুরাসিক ওয়ার্ল্ড ডোমিনিয়ন ছবিটির জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছে, তবু এই অধ্যয়নের ফলাফলগুলি সম্ভবত বিলুপ্তপ্রায় দৈত্য পাখি এবং টেরোসরদের পরবর্তী কাহিনিগুলি চিত্রিত করার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনবে।
এই গবেষণার ফলাফল 10 মার্চ, 2022-এ PNAS নেক্সাসের প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল । এই গবেষণাটির ব্যয়ভার বহন করেছিল JSPS KAKENHI, যার মধ্যে রয়েছে ট্রান্সফরমেটিভ রিসার্চ ক্ষেত্রের জন্য সমপরিমাণ অর্থবরাদ্দ। এর বিষয় হল “হায়ারার্কিক্যাল বায়ো-নেভিগেশন ইন্টিগ্রেটিং সাইবার-ফিজিক্যাল স্পেস।”